বাংলাদেশের বন্ধ পাটকলগুলোতে নতুন করে বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ পাটকল ইজারা নিয়ে প্রাণ-আরএফএল ও হ্যামকো গ্রুপ খুলনা ও সিরাজগঞ্জের তিনটি কারখানায় প্রায় ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এসব প্রকল্পে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে থাকা তিনটি পাটকল ইজারা পেতে যাচ্ছে দেশের এই দুই শিল্পগোষ্ঠী।
কোন কোন পাটকল ইজারা পাচ্ছে
হ্যামকো গ্রুপের আবদুল্লাহ ব্যাটারি কোম্পানি ৩০ বছরের জন্য খুলনার খালিশপুরের প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল ইজারা পাবে।
অন্যদিকে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ইজারা পাচ্ছে খুলনার দিঘলিয়ার স্টার জুট মিলস এবং সিরাজগঞ্জের রায়পুরের জাতীয় জুট মিলস।
বিজেএমসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইজারা নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করার প্রক্রিয়া চলছে।
প্রাণ-আরএফএলের বিনিয়োগ পরিকল্পনা
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ দুটি পাটকলের জন্য মোট প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। এতে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে।
খুলনার স্টার জুট মিলসের প্রায় ৪৬ একর জমিতে উচ্চমূল্যের পাটপণ্য, আসবাব ও এমডিএফ বোর্ডসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে এবং প্রায় ৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
অন্যদিকে সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলের প্রায় ৩৮ একর জমিতে তৈরি পোশাক, হস্তশিল্প, ব্যাগ, জুতা ও খেলনা উৎপাদনের কারখানা গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি কাঁচামাল, প্যাকেজিং ও পণ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থাও করা হবে।
এই প্রকল্পে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে।
রপ্তানিতেও নজর প্রাণ-আরএফএলের
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ জানিয়েছে, নতুন কারখানাগুলোতে শুধু দেশের বাজারের জন্য নয়, রপ্তানির জন্যও পণ্য তৈরি করা হবে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের মতে, প্রস্তুত জমি ও বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করতে পারায় দ্রুত উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হবে। এতে নতুন করে জমি কেনা ও কারখানা নির্মাণের তুলনায় সময় ও খরচ দুটোই কমবে।
এর আগে রাজশাহীর দুটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কারখানাও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে চালু করেছে প্রাণ-আরএফএল। সেখানে বর্তমানে কয়েক হাজার মানুষ কাজ করছেন।
হ্যামকোর পরিকল্পনায় ব্যাটারি ও পাটপণ্য
খুলনার প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে হ্যামকো গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি সেখানে দুটি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে।
এর একটি হবে পাট থেকে বিশেষায়িত ম্যাট্রেস তৈরির কারখানা। উৎপাদিত এসব পণ্য বিদেশের বাজারে রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে। চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে কারখানাটি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্য কারখানায় লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদন করা হবে। এ ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে ব্যাটারির সেল এনে দেশে ব্যাটারি তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থান
হ্যামকোর দুটি কারখানায় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিজেএমসি জমি বুঝিয়ে দেওয়ার পর কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সবকিছু ঠিক থাকলে প্রায় এক বছরের মধ্যে দুটি কারখানার উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হতে পারে।
বন্ধ পাটকলের নতুন সম্ভাবনা
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো দীর্ঘদিন লোকসানের মুখে ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালে দেশের ২৫টি পাটকল বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বিপুলসংখ্যক স্থায়ী শ্রমিককে স্বেচ্ছা অবসরে পাঠানো হয়।
এরপর বন্ধ পাটকলগুলো বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়। এখন পর্যন্ত বিজেএমসি ১৪টি পাটকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দিয়েছে। এর মধ্যে ৯টি কারখানায় উৎপাদন শুরু হয়েছে।
নতুন করে প্রাণ-আরএফএল ও হ্যামকোর বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে বন্ধ শিল্পকারখানাগুলো আবার উৎপাদনে ফিরবে। একই সঙ্গে পাটপণ্য, ব্যাটারি, পোশাক, জুতা, খেলনা ও অন্যান্য শিল্পপণ্যের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি বড় পরিসরে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

