মৌলভীবাজারের রাজনগরে প্রায় চার দশক ধরে একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন বেলা রানী দেব। কর্মজীবনের পুরো সময়টুকু একই প্রতিষ্ঠানে কাটানোর পর অবসরে গেলেন তিনি। তবে তাঁর বিদায় ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী, যা স্থানীয় মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে দীর্ঘদিন।
সোমবার বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর সম্মানে আয়োজন করা হয় বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের। বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সহকর্মী এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এতে অংশ নেন। অনুষ্ঠানে ফুল, শুভেচ্ছা ও উপহারে ভরিয়ে দেওয়া হয় প্রিয় শিক্ষিকাকে।
বৃষ্টির মধ্যেও থামেনি আয়োজন
দিনজুড়ে মেঘলা আবহাওয়া ও বৃষ্টির কারণে কিছুটা বাধা তৈরি হলেও আয়োজন বন্ধ হয়নি। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিশেষ মঞ্চ তৈরি করা হয় এবং শিক্ষার্থী ও অতিথিদের জন্য বসার ব্যবস্থা করা হয়।
বেলা রানী দেব বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর পর তাঁকে ঘিরে আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এসে শুভেচ্ছা জানান। অনেকেই দীর্ঘদিনের স্মৃতি মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায় ভরা বিদায়
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রশাসনের কর্মকর্তা, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় ব্যক্তিরা। সবাই বেলা রানী দেবের দীর্ঘ কর্মজীবন, নিষ্ঠা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর অবদানের কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে প্রিয় শিক্ষিকার হাতে ফুল ও উপহার তুলে দেয়। ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের এই ভালোবাসা উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে।
একই বিদ্যালয়ে ৩৯ বছরের পথচলা
১৯৮৭ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন বেলা রানী দেব। এরপর পুরো কর্মজীবন তিনি এই বিদ্যালয়েই কাটিয়েছেন।
এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থীকে পাঠদান করেছেন। অনেক শিক্ষার্থী এখন দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, আবার কেউ কেউ বিদেশেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
‘স্কুলটাই ছিল আমার পরিবার’
বিদায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে বেলা রানী দেব বলেন, বিদ্যালয়টি তাঁর কাছে শুধু কর্মস্থল নয়, বরং পরিবারের মতো।
তিনি জানান, বছরের পর বছর যেসব শিক্ষার্থীকে তিনি পড়িয়েছেন, তাঁদের কাছ থেকে এমন ভালোবাসা ও সম্মান পেয়ে তিনি অভিভূত। এই মুহূর্ত তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে বলেও উল্লেখ করেন।
ঘোড়ার গাড়িতে রাজকীয় বিদায়
অনুষ্ঠান শেষে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে ঘোড়ার গাড়িতে করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন বেলা রানী দেব। তাঁর বিদায়কে স্মরণীয় করে তুলতে ঘোড়ার গাড়ির সামনে ও পেছনে ছিল মোটরসাইকেলের বহর।
বিদ্যালয়ের ফটক থেকে শুরু করে পুরো পথজুড়ে শিক্ষার্থী ও স্থানীয় মানুষ তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। নানা রঙের উৎসবমুখর পরিবেশে বিদায় নেন এই শিক্ষিকা।
ভালো শিক্ষক কখনো ভোলা যায় না
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, একজন শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য তাঁর শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায় প্রকাশ পায়। বেলা রানী দেব তাঁর নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে অসংখ্য শিক্ষার্থীর হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন।
অবসর গ্রহণের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের একটি অধ্যায় শেষ হলেও শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে তিনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন। তাঁর এই ব্যতিক্রমী বিদায় প্রমাণ করে, একজন আদর্শ শিক্ষক সমাজে কতটা সম্মান ও ভালোবাসার অধিকারী হতে পারেন।

