বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আবারও তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। নরসিংদীতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও অনেক কারখানা এখনো স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। একই সময়ে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে কারখানার উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের বেতন ও ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
এলএনজি সরবরাহে ফের সংকট
দেশের শিল্পখাতে গ্যাসের সংকট প্রায় এক মাস ধরে চলছে। এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহের সমস্যায় একটি টার্মিনালের দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা।
সম্প্রতি সামিটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হলে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ে। এতে শিল্পকারখানাগুলোতে সাময়িক স্বস্তি ফিরেছিল।
তবে সেই স্বস্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কয়েক দিন ধরে সরবরাহ কমার পর বুধবার বিকেলে কার্গো সংকটের কারণে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সামনে সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নরসিংদীতে অনেক কারখানা বন্ধ
নরসিংদী সদর ও মাধবদী এলাকার বিভিন্ন শিল্পকারখানায় সরেজমিনে দেখা গেছে, গ্যাসের অভাবে অধিকাংশ গ্যাসনির্ভর কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক-কর্মচারীরা কারখানায় থাকলেও কাজ না থাকায় অলস সময় কাটাচ্ছেন।
তাসফিয়া ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং মিলসের উৎপাদনও গ্যাস সংকটে বন্ধ রয়েছে। কারখানাটির ভেতরে বিভিন্ন ধরনের কাপড় পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রিন্টিং মাস্টার আশুতোষ বৈষ্ণব জানান, কয়েক দিন আগে এক দিনের জন্য গ্যাস পাওয়া গেলেও পরে আবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মেশিনে থাকা কাপড়ের প্রক্রিয়াজাতকরণ শেষ করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ সময় পড়ে থাকায় কাপড় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এতে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কিছু কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক
তবে নরসিংদীর সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি একই নয়। পলাশে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের শিল্পপার্কগুলোতে বর্তমানে গ্যাসের চাপ তুলনামূলক ভালো থাকায় উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েক দিন গ্যাসের চাপ কম থাকলেও পরে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় কারখানাগুলোতে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন চলছে।
গাজীপুরে উৎপাদন নেমেছে ২৫ শতাংশে
গাজীপুরের মাওনা এলাকায় গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিরামিক শিল্পেও। আর্টিসান সিরামিকসের উৎপাদন সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ২২ হাজার পিস হলেও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বুধবার উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৬ হাজার পিস।
অর্থাৎ স্বাভাবিক সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন প্রায় এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, গত কয়েক দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। আগে রাতে কিছুটা গ্যাসের চাপ পাওয়া গেলেও এখন সেটিও নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানোর প্রয়োজন হয় এমন পণ্য তৈরি করা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে কিছু ক্রয়াদেশ স্থগিত হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জেও ডাইং কারখানা বন্ধ
নারায়ণগঞ্জের বিসিক শিল্প এলাকাতেও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে কাপড় ডাইং ও ফিনিশিং কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
এর ফলে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহেও সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, কয়েক দিন গ্যাসের চাপ ভালো থাকার পর মঙ্গলবার দুপুর থেকে আবার পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ডাইং কারখানাগুলো বন্ধ থাকলে এর প্রভাব সরাসরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিতে পড়তে পারে।
চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কম
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। প্রায় ৩০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা গেলে বিভিন্ন খাতে মোটামুটি পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব।
তবে স্বাভাবিক সময়েও রেশনিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ আরও নিচে নেমে গেছে। গত শুক্রবার বিকেলে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল মাত্র ১৭৩ কোটি ঘনফুট। পরদিন তা বেড়ে ২৪৪ কোটি ঘনফুটে উঠলেও বুধবার আবার কমে ২১৮ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের বাড়ছে উদ্বেগ
গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু কারখানার উৎপাদনই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, এর প্রভাব পড়তে পারে কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও সামগ্রিক শিল্প অর্থনীতিতেও।
সিরামিক শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, হবিগঞ্জ ও ভোলা ছাড়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলের অনেক গ্যাসনির্ভর কারখানাই বর্তমানে সংকটে রয়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি ও অন্যান্য স্থায়ী খরচ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে শিল্পমালিকদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের বেতন নিয়ে সমস্যা তৈরি হলে সামাজিক অস্থিরতার আশঙ্কাও রয়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, দেশের শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন জরুরি।

