গ্যাস সরবরাহের সংকটে দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এবার এর প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। বিশেষ করে চিনি সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি বেড়েছে প্যাকেটজাত আটার দামও।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বাজারে চিনির সরবরাহ প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় পাইকারি বাজারে চিনির দাম বেড়েছে। পরে সেই প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও।
গ্যাস সংকটে কমেছে চিনির সরবরাহ
বাংলাদেশে আমদানি করা অপরিশোধিত চিনি পরিশোধন করে বাজারজাত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় শিল্পকারখানায় গ্যাসের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক চিনি পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না।
বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আবুল হাসেম জানিয়েছেন, গ্যাসের সংকটের কারণে চিনিকলগুলোর উৎপাদন কমেছে। ফলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বাজারে সরবরাহ প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
তাঁর মতে, অনেক মিলের সামনে পণ্য নেওয়ার জন্য ট্রাক অপেক্ষা করলেও চাহিদা অনুযায়ী চিনি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। কোনো কোনো কারখানা সক্ষমতার মাত্র ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ করতে পারছে। আবার কিছু মিল থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
খুচরা বাজারে চিনির দামও বেড়েছে
সরবরাহ সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে খুচরা বাজারে স্পষ্ট হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারের ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৫০ কেজির চিনির বস্তায় প্রায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
খোলা চিনি কয়েক দিন আগেও কেজিপ্রতি প্রায় ১০৫ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা ১১৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। অর্থাৎ খুচরা পর্যায়ে কেজিতে প্রায় ১০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারেও চিনির দাম বেড়েছে। গত সপ্তাহে সেখানে প্রতি মণ খোলা চিনির দাম ছিল প্রায় ৩ হাজার ৬০০ টাকা। এখন তা বেড়ে ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গত সপ্তাহে প্রতি কেজি খোলা চিনি ১০০ থেকে ১০৫ টাকায় বিক্রি হলেও এখন দাম প্রায় ১১০ টাকা।
প্যাকেটজাত আটার দামও বেড়েছে
চিনির পাশাপাশি প্যাকেটজাত আটার দামও বেড়েছে। বর্তমানে ২ কেজির আটার প্যাকেট বাজারে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কয়েক দিন আগেও একই প্যাকেট ১০০ থেকে ১০৫ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত।
অর্থাৎ দুই কেজির প্যাকেটজাত আটায় ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে।
তবে পাইকারি ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গম, আটা ও ময়দার সামগ্রিক সরবরাহ এখনো তুলনামূলক স্বাভাবিক রয়েছে। ফলে সব ধরনের আটা-ময়দায় একই মাত্রায় সংকট তৈরি হয়নি।
ভোজ্যতেলেও সরবরাহের চাপ
গ্যাস সংকটের প্রভাব ভোজ্যতেল প্রক্রিয়াজাতকারী শিল্পেও পড়েছে। সয়াবিন তেলের সরবরাহ কিছুটা কমলেও এখনো খুচরা পর্যায়ে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায়নি।
তবে আন্তর্জাতিক বাজার ও স্থানীয় সরবরাহ পরিস্থিতির কারণে পাম তেলের দাম বেড়েছে। পাইকারি পর্যায়ে প্রতি মণে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে, যা কেজিতে প্রায় ১ টাকার সমান।
চট্টগ্রামের বাজারে তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় আপাতত সেখানে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
গ্যাস সংকট দীর্ঘ হলে বাড়তে পারে চাপ
দেশের চিনি পরিশোধন খাতে বর্তমানে কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, সিটি গ্রুপ এবং আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হলে বাজারে সরবরাহের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, গ্যাসের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে চিনি ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত নিত্যপণ্যের উৎপাদন আরও কমতে পারে। এতে সরবরাহ পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে বাজারে দাম বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে গ্যাস সংকট শুধু শিল্প উৎপাদনের সমস্যা হিসেবে থাকছে না; এর প্রভাব ধীরে ধীরে সাধারণ ভোক্তার দৈনন্দিন বাজার খরচেও পড়ছে। চিনি ও আটার পর অন্য নিত্যপণ্যের বাজারেও এর প্রভাব কতটা ছড়ায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

