সংবিধান সংশোধনে ফের গণভোটের উদ্যোগ, প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন
সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে আবারও গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি জানিয়েছে, সংসদে সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদসহ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনা হলে তা গণভোটে দিতে হবে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে গণভোট হয়ে গেছে।
বিষয়টি নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও ভিন্ন মত রয়েছে। কেউ মনে করছেন, উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে সংবিধানে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল হয়ে থাকলে আবার নতুন করে সেই বিধান অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে আরেক পক্ষ বলছে, নতুন করে সংবিধানের মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনা হলে জনগণের মতামত নেওয়ার জন্য গণভোটের প্রয়োজন হতে পারে।
সরকার কেন আবার গণভোটের কথা বলছে
সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, প্রস্তাবনা, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের কিছু জায়গায় সংসদ পরিবর্তন আনলে তা গণভোটে দিতে হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। কমিটি ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এরপর আইন মন্ত্রণালয় আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংসদে সংশোধনী বিল তুলতে পারে এবং বিল অনুমোদনের পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোট হতে পারে।
এর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে পাস হওয়ার পর গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ফেব্রুয়ারির গণভোট নিয়ে কী হয়েছিল
জুলাই জাতীয় সনদে থাকা ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয় এবং পরে ফলের গেজেটও প্রকাশ করা হয়।
গণভোটের ব্যালটে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং সনদে থাকা সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে সম্মতি চাওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের গঠন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদসহ বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব ছিল।
এ কারণে নতুন করে গণভোটের উদ্যোগকে কীভাবে দেখা হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
জামায়াত ও এনসিপির আপত্তি
জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাজিবুর রহমানের দাবি, ফেব্রুয়ারির গণভোটে জনগণ যে মতামত দিয়েছে, সরকার সেটিকে বিবেচনায় না নিয়ে নতুন গণভোটের উদ্যোগ নিয়েছে। তাঁর মতে, নতুন ভোটের মাধ্যমে আগের গণভোটের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের চেষ্টা হতে পারে।
এনসিপির মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষারও নতুন প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির গণভোটের ফলকে পাশ কাটিয়ে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এগুলো সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের বক্তব্য; সরকারের অবস্থান এর সঙ্গে এক নয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের ভিন্ন মত
পুনরায় গণভোটের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়ার মতে, আদালতের রায়ে কোনো সাংবিধানিক বিধান পুনর্বহাল হলে সেটিকে কার্যকর করতে আবার সংসদে আইন পাসের প্রয়োজন নেই। তিনি এ ক্ষেত্রে অষ্টম সংশোধনী মামলার দৃষ্টান্তের কথা উল্লেখ করেছেন।
ব্যারিস্টার ইমরান এ সিদ্দিকও মনে করেন, উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে গণভোটের বিধান সংবিধানে পুনর্বহাল হয়ে থাকলে সেটিকে আবার সংশোধনের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন নেই। তবে তিনি বলেছেন, প্রস্তাবনা, ৮, ৪৮, ৫৬ বা ১৪২ অনুচ্ছেদে নতুন কোনো সংশোধন আনা হলে সরকার গণভোট আয়োজন করতে পারে। একই সঙ্গে ১৪২ অনুচ্ছেদসংক্রান্ত আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বিষয়টি পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত দিয়েছেন।
সরকারের অবস্থানের পক্ষে আরেক ব্যাখ্যাও আছে
গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল বলেছেন, যেকোনো মৌলিক সাংবিধানিক সংশোধনের ক্ষেত্রে জনগণের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার পরিষদ গঠিত না হওয়ায় গণভোটের প্রয়োজন রয়েছে।
অর্থাৎ, বিতর্কটি শুধু রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; গণভোটের সাংবিধানিক ভিত্তি ও ফেব্রুয়ারির গণভোটের ফল কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—সেটিও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফল
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনার পর জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে সনদে স্বাক্ষর হয়। পরে এর সাংবিধানিক সংস্কারসংক্রান্ত অংশ জনগণের অনুমোদনের জন্য গণভোটে দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হওয়ার পর ফল গেজেট আকারে প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন।
এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, ওই গণভোটের ফলের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে এবং নতুন কোনো সংশোধনীতে আবার গণভোটের প্রয়োজন হবে কি না। এ বিষয়ে সরকারের প্রস্তাব, সংসদীয় প্রক্রিয়া এবং আদালতের রায়—তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সামনে কী হতে পারে
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশেষ কমিটি ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে পারে। এরপর সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিলের বিষয়বস্তু ও সংবিধানের কোন কোন অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনা হবে, তার ওপর পরবর্তী গণভোটের প্রশ্নটিও নির্ভর করতে পারে।
ফলে সংবিধান সংশোধন নিয়ে সামনে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, সংসদের কার্যক্রম এবং আদালতের সংশ্লিষ্ট রায়—সব মিলিয়ে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

