ডেঙ্গু রোগীর হিসাব নিয়ে বড় গরমিল
রাজধানীর চারটি বড় হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যার সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেছে। হাসপাতালগুলোর তথ্য ও সরেজমিনে রোগী গণনার সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দেওয়া হিসাব মিলছে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মোট ৮১৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন।
অন্যদিকে, একই চার হাসপাতালের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের হিসাবে রোগীর সংখ্যা ছিল ৩১৬ জন। অর্থাৎ হাসপাতালগুলোর তথ্যের তুলনায় ৫০১ জন বা প্রায় ৬১ শতাংশ রোগী কম দেখানো হয়েছে।
মুগদা হাসপাতালে সবচেয়ে বড় পার্থক্য
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গতকাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হিসাবে ২২৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। সরেজমিনে রোগী গণনাতেও প্রায় একই সংখ্যা পাওয়া যায়।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের প্রকাশিত তথ্যে ওই হাসপাতালে রোগী ভর্তি দেখানো হয় মাত্র ৪৯ জন। অর্থাৎ হাসপাতালের হিসাবের তুলনায় ১৭৪ জন কম দেখানো হয়েছে।
এ ছাড়া ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত মুগদা হাসপাতালে ৪ হাজার ১৯৯ জন রোগী ভর্তি হওয়ার তথ্য দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কন্ট্রোল রুমের হিসাবে এই সংখ্যা ১ হাজার ৭৭৩ জন।
ঢাকা মেডিকেলেও ৯৫ রোগীর গরমিল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের তিনটি ওয়ার্ডে সরেজমিনে ১২৮ জন ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যায়। হাসপাতালের পরিচালকের দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ২০০ জন, যার মধ্যে ৩১ জন শিশু।
কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের হিসাবে ঢাকা মেডিকেলে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন ১০৫ জন। হাসপাতালের দেওয়া হিসাবের সঙ্গে এখানে ৯৫ জনের পার্থক্য রয়েছে।
বছরের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালটির হিসাবে ২ হাজার ৩৯৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। বিপরীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে এ সংখ্যা ২ হাজার ১২৭ জন।
সোহরাওয়ার্দী ও শিশু হাসপাতালেও পার্থক্য
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গতকাল সেখানে ২৪২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে রোগীর সংখ্যা ১৫৪ জন। অর্থাৎ ৮৮ জন কম দেখানো হয়েছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ক্ষেত্রেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। হাসপাতালের পরিচালকের দপ্তরের হিসাবে সেখানে ১৫২ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমে রোগী দেখানো হয়েছে মাত্র ৮ জন।
এখানে এক দিনের হিসাবে ১৪৪ জনের পার্থক্য পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বক্তব্য
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইসমত আরা বলেছেন, হাসপাতালগুলো থেকে যে পরিসংখ্যান পাঠানো হয়, সেটিই প্রকাশ করা হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভুল পরিসংখ্যান প্রকাশের সুযোগ নেই।
তবে বিভিন্ন হাসপাতালের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে প্রকাশিত পরিসংখ্যানের এই পার্থক্য ডেঙ্গু পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ডেঙ্গু রোগীর হিসাব কেন গুরুত্বপূর্ণ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রাজধানীর সব বেসরকারি হাসপাতাল ও দেশের বাইরের সব বেসরকারি হাসপাতাল থেকে নিয়মিত তথ্য পায় না। অনেক রোগী আবার চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার থেকেও চিকিৎসা নেন।
তবে যেসব হাসপাতাল থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের তথ্যেও গরমিল থাকলে ডেঙ্গুর প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেনের মতে, রোগীর সংখ্যা কম দেখানো হলে ডেঙ্গুর প্রকৃত চিত্র জানা কঠিন হবে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায়ও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে নতুন করে ১ হাজার ৬৫৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ছয়জন।
চলতি বছরে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ৬৩ হাজার ৬২৭ জন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১৯০ জনের।
ডেঙ্গু রোগীর প্রকৃত সংখ্যা ও পরিস্থিতি বুঝতে হাসপাতালভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ এবং তা নিয়মিত হালনাগাদ করা গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

