মানবতাবিরোধী অপরাধে মাহবুব উল আলম হানিফের মৃত্যুদণ্ড
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই মামলায় কুষ্টিয়ার আওয়ামী লীগের তিন নেতাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায়ের আগে বাসস ও অন্যান্য প্রতিবেদনে মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া ও অভিযোগের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছিল। BSS
হানিফসহ চার আসামি
মামলায় মাহবুব উল আলম হানিফ ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান।
রায়ের তথ্য অনুযায়ী, হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্য তিন আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। চার আসামিই বিচার চলাকালে পলাতক ছিলেন। তাঁদের সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করারও আদেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে বাসস জানিয়েছিল, আসামিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় তাঁদের অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্যক্রম চলছিল এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর মাধ্যমে তাঁদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করা হয়। BSS
আসামিদের বিরুদ্ধে তিন অভিযোগ
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছিল।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৫, ১৭ ও ৩০ জুলাই আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে উপস্থিত থেকে তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন করেছিলেন হানিফ। একই সঙ্গে ২৯ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবের একটি আলোচনা সভায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানি, প্ররোচনা ও সহায়তার অভিযোগও আনা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শান্তিপূর্ণ ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রসিকিউশন অভিযোগ করে।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর গুলির ঘটনা ঘটে। প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ঘটনায় ছয়জন নিহত হন।
মামলার রায়ের আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এসব অভিযোগের মধ্যে আন্দোলন দমনে রাজনৈতিক নির্দেশনা, কুষ্টিয়ায় একটি বৈঠকে হত্যার নির্দেশ এবং ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনার সংশ্লিষ্টতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। United News Bangladesh
কুষ্টিয়ায় নিহত ছয়জন
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় নিহত ছয়জন হলেন—আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, বাবুল ফরাজী ও ইউসুফ শেখ।
এই ছয়জনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাই মামলার অন্যতম প্রধান অভিযোগ হিসেবে বিচার করা হয়।
১৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ
মামলার তদন্ত শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ। পরে তদন্ত প্রতিবেদন চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয় এবং আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়।
২০২৫ সালের ২ নভেম্বর চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। এরপর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের ধাপ শেষ হয়।
মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। ২০২৬ সালের ২৩ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। পরে ১০ জুন যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল। অতিরিক্ত সাক্ষ্য ও নথি উপস্থাপনের পর আবারও যুক্তিতর্ক হয় এবং ৭ অক্টোবর তা শেষ হয়। BSS
রায়ের আগে সর্বোচ্চ সাজা চেয়েছিল প্রসিকিউশন
মামলার যুক্তিতর্কে রাষ্ট্রপক্ষ চার আসামির সর্বোচ্চ সাজা চেয়েছিল। প্রসিকিউশনের দাবি ছিল, হানিফ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থান ব্যবহার করে আন্দোলন দমনে উসকানি, পরিকল্পনা ও সহায়তার ভূমিকা পালন করেছেন।
প্রসিকিউশন আদালতে টেলিফোন কথোপকথনের রেকর্ড, বিভিন্ন নথি এবং সাক্ষীদের বক্তব্য উপস্থাপনের কথা জানিয়েছিল। Bangla Tribune
মামলার বিচার অনুপস্থিতিতে
চার আসামিই পলাতক থাকায় তাঁদের অনুপস্থিতিতে বিচার হয়েছে। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। পরে ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। BSS
রায়ের মধ্য দিয়ে কুষ্টিয়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনায় করা এই মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হলো।

