চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের হাতে, ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনালগুলোতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে পতেঙ্গা, লালদিয়ার চর ও পানগাঁও আইসিডিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে বা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) ১৫ বছরের জন্য আন্তর্জাতিক অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার প্রস্তাবেও নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ এবং বে পোর্ট-মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নিয়েও বিদেশি অপারেটর নিয়োগের আলোচনা চলছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আরএসজিটিআই) এসব টার্মিনাল পরিচালনায় আগ্রহ দেখিয়েছে।
এনসিটি পরিচালনায় ১৫ বছরের প্রস্তাব
গত ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এনসিটি ও ওসিওয়াই পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটরের সঙ্গে ১৫ বছরের কনসেশন চুক্তির খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারি PPP Authority-এর প্রকল্প তথ্যেও এনসিটি ও ওসিওয়াই উন্নয়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে দুবাই সরকারের মনোনীত অপারেটর হিসেবে DP World-এর কথা উল্লেখ রয়েছে।
২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ এনসিটির মাধ্যমে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বন্দরের কনটেইনার কার্যক্রমে এনসিটির গুরুত্ব বেশ বড়।
আরও তিন টার্মিনালে বিদেশি আগ্রহ
সিসিটি, জেনারেল কার্গো বার্থ এবং বে পোর্ট-মাল্টিপারপাস টার্মিনাল পরিচালনার বিষয়ে সৌদি আরবভিত্তিক আরএসজিটিআই আগ্রহ দেখিয়েছে। এ বিষয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই। বন্দর সচিবও বলেছেন, বিষয়গুলো সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
সরকারের যুক্তি সক্ষমতা বাড়ানো
নৌপরিবহনসচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্দরের টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ সরকারের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। তাঁর দাবি, আন্তর্জাতিক অপারেটরের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়তে পারে এবং শ্রমিকেরা আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা পেতে পারেন।
সরকারের PPP Authority-এর প্রকল্প তথ্যেও এনসিটি প্রকল্পে উন্নয়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
শ্রমিকদের আপত্তি
তবে চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার বিষয়ে শ্রমিক-কর্মচারী নেতাদের মধ্যে আপত্তি রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদি কনসেশনের মাধ্যমে বন্দর পরিচালনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান ও জাতীয় স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন দাবি করেছেন, বিদেশি অপারেটর নিয়োগ হলে সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্ব কমে যেতে পারে এবং দেশীয় কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এগুলো শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য ও আশঙ্কা; এর কোনোটি নিশ্চিত বাস্তব ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা
এনসিটি ও ওসিওয়াইয়ের প্রস্তাবিত কনসেশন চুক্তি বাতিল এবং সিসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বন্ধের দাবি জানিয়েছে বন্দর রক্ষা কমিটি। সংগঠনটি এনসিটি পরিচালনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও বিদেশি অপারেটরের ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্য আয়, সক্ষমতা, প্রযুক্তি ও আর্থিক সুবিধা নিয়ে তুলনামূলক মূল্যায়ন প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।
কমিটি জানিয়েছে, ৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান গেটে দিনব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে। সরকার তাদের দাবিতে সাড়া না দিলে পরবর্তী আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করার কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।
এর আগে ৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় বন্দর কলোনি এলাকায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর এক প্রতিবাদ সমাবেশেও এনসিটি ও সিসিটি বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার উদ্যোগের বিরোধিতা করা হয়।
বিদেশি অপারেটর নিয়োগের আগের সিদ্ধান্ত
চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি নতুন নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য আরএসজিটিআইয়ের সঙ্গে ২২ বছরের চুক্তি সই করা হয়।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর লালদিয়ার চর ও পানগাঁও টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস এবং সুইজারল্যান্ডের মেডলগকে নিয়োগের কথা জানানো হয়েছে।
এখন এনসিটি-ওসিওয়াইয়ের প্রস্তাব এবং সিসিটি, জেনারেল কার্গো বার্থ ও বে পোর্ট-মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নিয়ে আলোচনার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা কাঠামো নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।

