চীনের এআই জোট গঠনের মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের সূচনা হলো। সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলনে (WAIC) চীনের নেতৃত্বে ২৯টি দেশের অংশগ্রহণে একটি নতুন আন্তর্জাতিক এআই সহযোগিতা সংস্থা গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু প্রযুক্তিগত সহযোগিতাই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক এআই ব্যবস্থার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত নয়। তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তিতে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান এবং এআই খাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
চীনের ঘোষিত নতুন সংস্থার নাম ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (WAICO)। সাংহাইভিত্তিক এই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ২৯টি দেশ যুক্ত হয়েছে। সদস্যদের মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, রাশিয়া, পাকিস্তান, সেনেগালসহ গ্লোবাল সাউথের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ।

বিশ্লেষকদের মতে, এই জোটের মাধ্যমে চীন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এআই প্রযুক্তির নীতিমালা, নিরাপত্তা এবং ব্যবহারবিধি নির্ধারণে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায়। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রযুক্তি-সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর কৌশলও এর পেছনে রয়েছে।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিশ্ব নেতৃত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, এআই চিপ, ডেটা সেন্টার এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে দুই দেশের প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বাড়ছে।
যদিও উন্নত চিপ উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্র এখনো এগিয়ে, তবে বিশাল ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এবং বিরল খনিজ সম্পদের দিক থেকে চীন উল্লেখযোগ্য সুবিধা ধরে রেখেছে। ফলে কম খরচে বড় পরিসরে এআই অবকাঠামো গড়ে তুলতে দেশটি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে চীনের ওপর বিভিন্ন প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এর পাল্টা জবাবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও কিছু দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি রপ্তানিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে বেইজিং। ফলে প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এখন বাণিজ্য যুদ্ধের নতুন রূপ নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের এআই জোট বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সমর্থনকে একত্রিত করে ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাবকে ভারসাম্যপূর্ণ করার চেষ্টা করছে বেইজিং।
বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলনে উন্নতমানের এআই মডেল, হিউম্যানয়েড রোবট, স্মার্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রযুক্তি এবং ওপেন-সোর্স এআই সমাধানও প্রদর্শন করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে চীন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—এআই খাতে বৈশ্বিক নেতৃত্বের দৌড়ে তারা দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিয়েই এগোচ্ছে।

