ভারতের শিক্ষার্থী বিক্ষোভ নতুন মাত্রা পেয়েছে রাজধানী নয়াদিল্লিতে। শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, জাতীয় পরীক্ষা কেলেঙ্কারির সুষ্ঠু তদন্ত এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে হাজারো শিক্ষার্থী কঠোর নিরাপত্তা ও বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ভারতের পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিল করেছে। ‘এখনই নয়তো কখনোই (Now or Never)’ স্লোগানে মুখর এই আন্দোলন বর্তমানে দেশটির অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
সোমবার সকালে দিল্লির যন্তর মন্তর (Jantar Mantar) এলাকা থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভে অংশ নেন বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা হাজারো শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণী। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয় সম্প্রতি আলোচনায় আসা ককরোচ জনতা পার্টি (Cockroach Janta Party – CJP), যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা দিয়ে শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যে শক্তিশালী যুব আন্দোলনে রূপ নেয়।
পরীক্ষা কেলেঙ্কারির বিচার চায় শিক্ষার্থীরা
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, চলতি বছরের জাতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (NEET) প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পরীক্ষা বাতিল ও পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার কারণে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও মানসিক চাপের মুখে পড়েছেন পরীক্ষার্থীরা।
১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আনশুকা রুথ দাস বলেন, “যেসব শিক্ষার্থী এই ঘটনার পর আত্মহত্যা করেছে, আমরা তাদের জন্য ন্যায়বিচার চাই। শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই আমরা এখানে এসেছি।”

ককরোচ জনতা পার্টির উত্থান
ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতারা জানান, ভারতের বিচার বিভাগের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা শুরু হলেও সেটিই পরে দেশজুড়ে তরুণদের প্রতিবাদের প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে।
সংগঠনটির অন্যতম নেতা অভিজিৎ দিপকে, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, সম্প্রতি ভারতে ফিরে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগসহ শিক্ষা ব্যবস্থার বড় ধরনের সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বেশ কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয় এবং কিছু এলাকায় ইন্টারনেট সেবাও সীমিত করা হয়।
তবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অনেককে আটক করা হয়েছে এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন।
বিহারের বাসিন্দা মোহাম্মদ আনিস বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করছিলাম। হঠাৎ লাঠিচার্জ শুরু হলে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আহত হলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা থেকে আমরা সরে দাঁড়াব না।”
সরকার আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছে
ককরোচ জনতা পার্টির মুখপাত্র সৌরভ দাস জানিয়েছেন, আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সরকার আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে.পি. নাড্ডার বৈঠকের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, পরীক্ষা কেলেঙ্কারির পূর্ণ তদন্ত এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।
বিশ্লেষকদের মত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের তরুণদের মধ্যে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ এখন সংগঠিত আন্দোলনের রূপ নিয়েছে।
তাদের মতে, দ্রুত পরিবর্তনশীল শ্রমবাজার, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি এবং উচ্চশিক্ষায় অনিয়মের কারণে তরুণদের ক্ষোভ বাড়ছে। এই আন্দোলন ভবিষ্যতে ভারতের রাজনীতি ও শিক্ষা নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া উত্তর প্রদেশের শিক্ষার্থী অঞ্জনি কুমানি বলেন, “এটি আমাদের ভবিষ্যতের লড়াই। হয় শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করবেন, নয়তো আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। এখনই সময়, নইলে আর কখনো নয়।”

