Homeবাণিজ্যবিশ্বের ১৫১ দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার চীন, কমছে না বৈশ্বিক নির্ভরতা

বিশ্বের ১৫১ দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার চীন, কমছে না বৈশ্বিক নির্ভরতা

একসময় বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর অন্যতম ছিল চীন। বিদেশি প্রভাব, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং সীমিত শিল্পভিত্তির কারণে দেশটির অবস্থান ছিল বেশ নাজুক। তবে কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই চীনই এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান শক্তি।

বর্তমানে বিশ্বের ১৫১টি দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার চীন। শিল্প উৎপাদন, প্রযুক্তি, কাঁচামাল সরবরাহ এবং বৈশ্বিক রপ্তানি ব্যবস্থায় দেশটির অবস্থান এতটাই শক্তিশালী যে অনেক দেশের অর্থনীতি সরাসরি চীনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে গেছে।

কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বৈশ্বিক শক্তি

১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর দেশটি মূলত কৃষিনির্ভর অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে শিল্পায়নের ভিত্তি তৈরি হয়।

১৯৭৮ সালে দেং জিয়াওপিংয়ের অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে চীনের উন্নয়নের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। বিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন এবং বাজারভিত্তিক নীতির কারণে দ্রুত বদলে যায় দেশটির অর্থনৈতিক চিত্র।

এরপর ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) যোগ দেওয়ার পর চীনের বৈশ্বিক উত্থান আরও দ্রুত হয়। দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

কেন চীনের ওপর নির্ভরশীল বিশ্ব?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক উপাদান ও মধ্যবর্তী পণ্যের বড় অংশই আসে চীন থেকে।

অনেক দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে চীনের সরবরাহ ব্যাহত হলে তাদের শিল্প কার্যক্রমও ঝুঁকিতে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চীন। ফলে শুধু ভোগ্যপণ্য নয়, শিল্প উৎপাদনের ক্ষেত্রেও দেশটির প্রভাব অত্যন্ত গভীর।

কোন দেশ সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল?

তথ্য অনুযায়ী, কম্বোডিয়ার মোট আমদানির প্রায় ৪৭ শতাংশ আসে চীন থেকে। মিয়ানমার, পেরু, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, চিলি এবং রাশিয়ার ক্ষেত্রেও চীনের অংশ উল্লেখযোগ্য।

এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলোর আমদানিতেও চীনের অংশ এখনও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের আমদানির একটি বড় অংশ চীননির্ভর।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চীন দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে রয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ২ হাজার ৬১ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে চীন থেকে। যা দেশের মোট আমদানির প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি।

চীন থেকে মূলত শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল, রাসায়নিক পণ্য, ইলেকট্রনিকস ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য আমদানি করা হয়। দেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পও ব্যাপকভাবে চীনা কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক: প্রতিযোগিতা ও নির্ভরতা

বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা বাড়লেও তাদের পারস্পরিক নির্ভরতা পুরোপুরি কমেনি।

স্মার্টফোন, খেলনা, ইলেকট্রনিকস ও বিভিন্ন ভোক্তা পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখনো চীনের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, উন্নত উড়োজাহাজ প্রযুক্তি এবং কিছু উচ্চমানের শিল্প উপকরণের জন্য চীন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে।

উচ্চ প্রযুক্তির বাজারেও এগোচ্ছে চীন

শুধু উৎপাদনশীল অর্থনীতি নয়, এখন উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে চীন।

বিশ্বের বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে চীনা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডি দ্রুত নেতৃত্বের দিকে এগোচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাটারি প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতেও ব্যাপক বিনিয়োগ করছে দেশটি।

বিশ্বের বিরল মৃত্তিকা খনিজের খনন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং চুম্বক উৎপাদনের বড় অংশও চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে প্রযুক্তি শিল্পে দেশটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

চীনের প্রভাব কি কমবে?

বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন দেশ সরবরাহ ব্যবস্থার বৈচিত্র্য বাড়ানোর চেষ্টা করলেও স্বল্পমেয়াদে চীনের বিকল্প তৈরি করা সহজ নয়।

কারণ, উৎপাদন অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমশক্তি, বিশাল সরবরাহ নেটওয়ার্ক এবং প্রতিযোগিতামূলক খরচ—এই চারটি ক্ষেত্রেই চীন এখনও অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে।

ফলে ভবিষ্যতে কিছু খাতে নির্ভরতা কমলেও বৈশ্বিক বাণিজ্যে চীনের কেন্দ্রীয় ভূমিকা দ্রুত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ