ভারতের উত্তরাঞ্চলের গ্রেটার নয়ডায় গড়ে ওঠা ‘নলেজ পার্ক থ্রি’ একসময় তরুণদের জন্য উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল ও ব্যবস্থাপনা কলেজ, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্র মিলিয়ে অঞ্চলটি পরিণত হয়েছে বড় একটি শিক্ষা হাবে।
প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করছেন। পরিবারের সঞ্চয়, ঋণ ও নানা আর্থিক ত্যাগের বিনিময়ে তাঁদের অনেকেই উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। কিন্তু ডিগ্রি অর্জনের পর প্রত্যাশিত চাকরি না পাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীর সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তায় পরিণত হচ্ছে।
শিক্ষার খরচ বাড়ছে, ঋণের বোঝাও বাড়ছে। অন্যদিকে প্রতিবছর যে সংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক হচ্ছেন, সেই অনুপাতে ভালো বেতনের চাকরি তৈরি হচ্ছে না।
ডিগ্রির সঙ্গে বাড়ছে ঋণের চাপ
বারানসির ১৮ বছর বয়সী হর্ষিত রাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংয়ের মতো প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। নয়ডা ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে ডিগ্রি শেষ করতে তাঁর প্রায় ১৫ হাজার ডলার ব্যয় হবে।
এর মধ্যে প্রায় ৭ হাজার ডলার ব্যাংকঋণ। পড়াশোনা শেষে তাঁর লক্ষ্য মাসে ৮০ হাজার রুপি আয় করা। তবে এর অর্ধেক বেতনের চাকরি পেলেও তিনি আপাতত সন্তুষ্ট থাকবেন।
কিন্তু এমন চাকরি পেলেও শিক্ষার পেছনে খরচ হওয়া অর্থ তুলতে তাঁর পাঁচ থেকে ছয় বছর সময় লাগতে পারে। স্নাতক হওয়ার এক বছর পর ঋণের ওপর বছরে ১০ শতাংশ সুদ যোগ হওয়ার কথা। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে আছেন হর্ষিত।
তিনি বলেন, সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন কি না, সেটিই এখন তাঁর বড় চিন্তা।
উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থী বাড়ছে, চাকরি সেই হারে নয়
ভারতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটি। প্রতি বছর এই সংখ্যা আরও প্রায় ২০ লাখ বাড়ছে।
যেসব পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে, তাদের কাছে উচ্চশিক্ষা এখনো সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। বিশেষ করে কৃষিকাজ বা কম মজুরির শ্রমের বাইরে ভালো ক্যারিয়ার গড়ার জন্য তরুণদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দেশটির সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি হওয়া অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। সেখানে সুযোগ না পাওয়া শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ বেছে নিচ্ছেন বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়।
নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরের এক দশকে ভারতে বেসরকারি কলেজের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ। এক দশকের তুলনায় এই সংখ্যা ৪১ শতাংশ বেশি। উচ্চশিক্ষায় থাকা শিক্ষার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন।
কিন্তু উচ্চশিক্ষার এই দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভালো চাকরি তৈরি হয়নি।
২৫ বছরের কম বয়সী স্নাতকদের বড় অংশ বেকার
আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২৫ বছরের কম বয়সী কলেজ স্নাতকদের প্রায় ৪০ শতাংশ বেকার।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো উচ্চ বেতনের নতুন চাকরির সংখ্যা। ভারতে বছরে ৫০০ ডলারের বেশি মাসিক বেতনের নতুন চাকরি তৈরি হয় আনুমানিক আড়াই লাখ।
এ ধরনের চাকরির ক্ষেত্রে নামী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকেন। কারণ দেশের শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ডিগ্রি এখনো নিয়োগদাতাদের কাছে বাড়তি গুরুত্ব পায়।
ভারতে প্রায় ৫৫০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও এর মাত্র এক-দশমাংশকে অভিজাত বা শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরা হয়।
এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পান আবেদনকারীদের ৫ শতাংশেরও কম। অথচ সেখানে গড় বার্ষিক টিউশন ফি ২৫০ ডলারের নিচে।
বেসরকারি প্রকৌশল শিক্ষায় বড় বিনিয়োগ
উদ্যোক্তা ও শিক্ষা ফেলোশিপ কর্মসূচির প্রতিষ্ঠাতা অক্ষয় সাক্সেনার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় চার লাখ শিক্ষার্থী বেসরকারি প্রকৌশল কলেজে পড়তে ২০ হাজার ডলারের বেশি ব্যয় করেন।
কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের স্নাতকদের বার্ষিক মধ্যম বেতন প্রায় ৩ হাজার ডলার। তাঁর মতে, গড়পড়তা একজন স্নাতকের চাকরির জন্য প্রস্তুত হওয়ার সক্ষমতাও মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ।
ফলে উচ্চশিক্ষায় বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেও অনেক পরিবার কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছে না।
অক্ষয় সাক্সেনার ভাষায়, তরুণদের কাছে এমন একটি ধারণা বিক্রি করা হয়েছে যে ডিগ্রি অর্জন করলেই চাকরি নিশ্চিত হবে। বাস্তব পরিস্থিতি অবশ্য সেই ধারণার সঙ্গে মিলছে না।
বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর বাড়ছে চাপ
একসময় প্রকৌশল ডিগ্রিকে ভারতের প্রযুক্তি খাতে প্রবেশের অন্যতম নিরাপদ পথ মনে করা হতো। ইনফোসিস ও টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুলসংখ্যক প্রযুক্তি কর্মসংস্থান তৈরি করেছে।
কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের কারণে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অনেক প্রচলিত চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
ভারতের ক্লাউড সফটওয়্যার কোম্পানি জোহোর সহপ্রতিষ্ঠাতা শ্রীধর ভেম্বুও সতর্ক করেছেন, শুধু শিক্ষার জন্য বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া তরুণদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে সুযোগ না পেলে বড় খরচ
নয়াদিল্লির উপকণ্ঠ নয়ডায় অ্যামিটি বিশ্ববিদ্যালয়ও অনেক শিক্ষার্থীর কাছে সরকারি প্রতিষ্ঠানে সুযোগ না পাওয়ার পর বিকল্প হিসেবে আসে।
অতুল আনন্দ এমনই একজন। বিহারের একটি শীর্ষ সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েও একটি দুর্ঘটনার কারণে সেখানে ভর্তি হতে পারেননি। পরে ঋণ নিয়ে অ্যামিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
ডিগ্রি ও জীবনযাত্রার ব্যয় মিলিয়ে তাঁর প্রায় ১৫ হাজার ডলার প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে রাজ্য সরকার তাঁকে প্রায় ৪ হাজার ডলার ঋণ দিয়েছে। বাকি অর্থের জোগান দিতে তাঁর পরিবারের সঞ্চয় প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে।
পরিবারের আর্থিক চাপ কমাতে অতুল রাতে ফ্রিল্যান্স গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ করেন। পড়াশোনা শেষে প্রযুক্তি খাতে বছরে প্রায় ১০ হাজার ডলারের চাকরি পাওয়ার আশা তাঁর।
তাঁর লক্ষ্য খুব বড় কিছু নয়—নিজের ঋণ পরিশোধ করা এবং পরিবারের ওপর থাকা আর্থিক চাপ কমানো।
তরুণদের হতাশা এখন বড় সামাজিক প্রশ্ন
ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়লেও সেই শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সামঞ্জস্য তৈরি হয়নি। ফলে ডিগ্রি অর্জনের পরও চাকরি না পাওয়া তরুণদের সংখ্যা বাড়ছে।
বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষায় উচ্চ ব্যয়ের কারণে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করেই ঋণের বোঝার মুখোমুখি হচ্ছেন। ভালো চাকরি না পেলে সেই ঋণ পরিশোধ করাই তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অক্ষয় সাক্সেনার মতে, এই পরিস্থিতি তরুণদের মধ্যে বড় ধরনের মানসিক সংকট তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে ভারতের সামনে এখন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর প্রশ্ন নয়। উচ্চশিক্ষার মান, শিক্ষার খরচ, শিক্ষার্থীদের ঋণ এবং ডিগ্রির সঙ্গে বাস্তব কর্মসংস্থানের সম্পর্ক—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
কারণ শুধু ডিগ্রি বাড়লেই যদি ভালো চাকরি না বাড়ে, তাহলে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন একসময় তরুণদের জন্য সুযোগের বদলে ঋণ ও হতাশার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

