Homeবাণিজ্যসংকট মোকাবিলায় মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানিতে আগ্রহ সরকারের

সংকট মোকাবিলায় মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানিতে আগ্রহ সরকারের

দেশে চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে সরকার। সম্প্রতি মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে জ্বালানিমন্ত্রী দেশটি থেকে গ্যাস আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের নিজস্ব সমুদ্রসীমায় গ্যাসের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। ফলে বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির পাশাপাশি দেশের নিজস্ব গ্যাসসম্পদ অনুসন্ধানেও জোর দেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ অংশে গ্যাস উত্তোলন নিয়ে প্রশ্ন

২০১২ সালে ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর ভারত ও মিয়ানমার তাদের অংশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ এগিয়ে নেয়। তবে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ২৬টি ব্লক থাকলেও সেখানে গ্যাস উত্তোলনে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।

কক্সবাজারের কুতুবদিয়া এলাকার কাছাকাছি মিয়ানমারের অংশে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর কাছেই বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রের ১২ ও ১৬ নম্বর ব্লক এবং অগভীর সমুদ্রের ১১ নম্বর ব্লক রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের ধারণা, মিয়ানমারের অংশে গ্যাস উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ গ্যাসের প্রবাহে বাংলাদেশের অংশও প্রভাবিত হতে পারে।

‘নিজেদের গ্যাসই আবার কিনতে হতে পারে’

এমআইএসটির অধ্যাপক ড. মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, মিয়ানমার তাদের অংশে গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন করেছে, কিন্তু বাংলাদেশের অংশে একই পর্যায়ে গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

তাঁর মতে, একদিকে মিয়ানমার গ্যাস উত্তোলন করছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ নিজেদের সম্ভাব্য গ্যাসসম্পদ উত্তোলন না করে আমদানির ওপর নির্ভর করছে। এর ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অংশের গ্যাসই পরোক্ষভাবে মিয়ানমারের কাছ থেকে কিনতে হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

আমদানি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত

মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির উদ্যোগকে পুরোপুরি নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ। তবে একই সঙ্গে তাঁরা দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলমের মতে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাস উত্তোলনের পরিবর্তে এলএনজি আমদানির দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, দেশের নিজস্ব গ্যাসসম্পদ থাকার পরও কেন সময়মতো তা উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

তিনি আরও বলেন, গ্যাস আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার পরামর্শ

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বাংলাদেশের গ্যাস অবকাঠামো যেহেতু আমদানিনির্ভরতার সঙ্গে যুক্ত, তাই প্রয়োজনের ক্ষেত্রে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির সুযোগ বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আরও জোরালো উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি দেশের স্থলভাগেও গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে বাপেক্সকে আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

বাপেক্সের ৪৮টি কূপ খননের যে পরিকল্পনা রয়েছে, সেটি বাস্তবায়নে সরকারকে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যেতে হবে বলেও মত দিয়েছেন তিনি।

পাইপলাইন স্থাপনেও বড় চ্যালেঞ্জ

মিয়ানমারের কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইন রাজ্যের ওপর দিয়ে বাংলাদেশে গ্যাস সরবরাহের জন্য পাইপলাইন স্থাপন করতে হলে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ ও বাধার বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ফলে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে শুধু গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করাই নয়, পাইপলাইন নির্মাণ, নিরাপত্তা এবং রাখাইন অঞ্চলের পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

দেশের গ্যাস সংকট মোকাবিলায় মিয়ানমার থেকে আমদানির উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়নযোগ্য হবে, তার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব গ্যাসসম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সরকার কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ