Homeসারাদেশমেহেরপুরের তিন সরকারি হাসপাতালে দেড় মাস ধরে অস্ত্রোপচার বন্ধ, ভোগান্তিতে রোগীরা

মেহেরপুরের তিন সরকারি হাসপাতালে দেড় মাস ধরে অস্ত্রোপচার বন্ধ, ভোগান্তিতে রোগীরা

মেহেরপুরের তিনটি সরকারি হাসপাতালে দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে অস্ত্রোপচারসেবা বন্ধ রয়েছে। অবেদনবিদ বা অ্যানেসথেসিওলজিস্ট না থাকায় হাসপাতালগুলোর অপারেশন থিয়েটার কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এতে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগী ও তাঁদের স্বজনদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলেও অনেক রোগীকে জেলার বাইরে বা বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে। এতে বাড়তি চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি ভোগান্তিও বেড়েছে।

মেহেরপুরের যে তিনটি সরকারি হাসপাতালে এই সংকট চলছে, সেগুলো হলো ২৫০ শয্যার মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল, ৫০ শয্যার মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তিন হাসপাতালের মধ্যে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে একজন অবেদনবিদ কর্মরত ছিলেন। তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী তিন হাসপাতালেই অস্ত্রোপচারের সময় দায়িত্ব পালন করতেন।

তবে গত ১৯ জুন অবেদনবিদ মেহেদি হাসানকে চুয়াডাঙ্গা জেনারেল হাসপাতালে বদলি করার পর থেকেই তিন হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। একই দিনে এ এম রকিবুর রহমানকে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে অবেদনবিদ হিসেবে পদায়ন করা হলেও তিনি সেখানে যোগ দেননি। পরে স্বাস্থ্য বিভাগ তাঁর পদায়ন বাতিল করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয় বলে জানান এ এম রকিবুর রহমান।

অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন যেসব রোগীর জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। অবেদনবিদের সংকটের কারণে এসব রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে। ফলে সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১১৫টি অস্ত্রোপচার করা হতো। এর মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ জন গাইনি রোগী, ৪০ থেকে ৪৫ জন সার্জারি রোগী এবং প্রায় ৩৫ জন অর্থোপেডিক রোগীর অস্ত্রোপচার করা হতো। বর্তমানে অবেদনবিদ না থাকায় এসব অস্ত্রোপচার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

শুধু অবেদনবিদের সংকট নয়, মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালেও চিকিৎসক সংকট রয়েছে। প্রায় ছয় মাস ধরে অর্থোপেডিকস, মেডিসিন, কার্ডিওলজি এবং চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞের পদ খালি রয়েছে। হাসপাতালের অনুমোদিত ৪২টি চিকিৎসক ও সহকারী চিকিৎসকের পদের মধ্যে ২২টিই শূন্য।

মেহেরপুরের সিভিল সার্জন এ কে এম আবু সাঈদ জানান, সংকট দ্রুত সমাধানের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত নতুন চিকিৎসক পদায়ন বা বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও চিকিৎসক সংকট প্রকট। সেখানে ৩১ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কাগজে-কলমে কর্মরত আছেন মাত্র ৮ জন। গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও ৩১ জন চিকিৎসকের অনুমোদিত পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ৬ জন। এর বাইরে জেনারেল হাসপাতাল থেকে আরও দুজন চিকিৎসক অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।

অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় রোগীরা। গাংনী পৌর এলাকার বাসিন্দা জয়নাব মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছেন। তাঁর পায়ে ফোড়া হওয়ায় চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছেন। এক সপ্তাহ ধরে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও অবেদনবিদ না থাকায় তাঁর অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না।

মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন মোহাম্মদ আলীর অবস্থাও একই। পেটে তীব্র ব্যথা নিয়ে তাঁকে মুজিবনগর থেকে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকায় তাঁকে আবার মুজিবনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ফিরতে হয়। জেলার বাইরে বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তিনি সরকারি হাসপাতালেই চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছেন।

মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাইনি বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট সুরাইয়া শারমিন জানান, অবেদনবিদ না থাকায় জরুরি রোগীদের বাধ্য হয়ে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হচ্ছে।

জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন থাকা রোগীদের অনেককেই শেষ পর্যন্ত বেসরকারি ক্লিনিকের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। এতে সরকারি হাসপাতালে যে চিকিৎসা তুলনামূলক কম খরচে পাওয়া সম্ভব, সেটির পরিবর্তে রোগীদের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

পারিবারিক কলহের ঘটনায় হাঁসুয়ার কোপে আহত ইমতিয়াজ হোসেনকেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাঁর হাতে চারটি ও মাথায় দুটি কোপ লাগে। চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর হাতের রগ কেটে গেছে এবং দ্রুত উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। কিন্তু হাসপাতালে অবেদনবিদ না থাকায় তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে স্বজনেরা সাত হাজার টাকা চুক্তিতে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করেন।

গাংনীর গাড়াবাড়িয়া গ্রামের দিনমজুর জব্বার মিয়ার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকেও অস্ত্রোপচারের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়েছে। মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পর জানতে পারেন সেখানে অস্ত্রোপচার বন্ধ। পরে তাঁকে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হয় এবং সেখানে ১৭ হাজার টাকা খরচ করে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানো হয়। দিনমজুর জব্বার মিয়াকে এই অর্থ ধারদেনা করে জোগাড় করতে হয়েছে।

মেহেরপুরের সরকারি হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকায় চিকিৎসাসেবার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে চিকিৎসক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দ্রুত অবেদনবিদ ও অন্যান্য শূন্য পদে চিকিৎসক নিয়োগ না হলে রোগীদের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে।

তবে খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শেখ মো. মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন করা হবে। এরপর শূন্য পদে চিকিৎসকদের পদায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ