দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে এডিনো ভাইরাসের সহসংক্রমণ। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, হামে আক্রান্ত যেসব শিশু এডিনো ভাইরাসেও সংক্রমিত হচ্ছে, তাদের শারীরিক জটিলতা দ্রুত বাড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত চিকিৎসায় প্রত্যাশিত সাড়া মিলছে না।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গুরুতর অসুস্থ শিশুদের ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ৩৫ শিশুর নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ জনের শরীরে এডিনো ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, এই সহসংক্রমণ রোগীদের অবস্থা দ্রুত খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, কিছু শিশু চিকিৎসার পরও সুস্থ না হওয়ায় তাদের ওপর রেসপিরেটরি প্যানেল টেস্ট করা হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে একসঙ্গে একাধিক ভাইরাস শনাক্ত করা সম্ভব হয় এবং তখনই হামের পাশাপাশি এডিনো ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়ে। তবে পরীক্ষাটি ব্যয়বহুল হওয়ায় দেশের সব সরকারি হাসপাতালে এটি সহজলভ্য নয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এডিনো ভাইরাস নতুন কোনো সংক্রমণ নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন দেশে রয়েছে এবং সাধারণত জ্বর, সর্দি কিংবা কাশির মতো উপসর্গ সৃষ্টি করে। অধিকাংশ মানুষ সহজেই সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু হামের সঙ্গে একই সময়ে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে রোগীর জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এ বয়সী অনেক শিশুর দ্রুত শ্বাসকষ্ট দেখা দিচ্ছে এবং ফুসফুসের কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সাদা ফুসফুস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
শিশু হাসপাতাল গত ২৩ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম ব্যবস্থাপনাবিষয়ক বৈঠকে বিষয়টি উপস্থাপন করলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (CDC) বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ইতোমধ্যে শিশু হাসপাতাল পরিদর্শন করেছে এবং সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বিশিষ্ট ভাইরাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মনে করেন, দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এডিনো ভাইরাসের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসার পরও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্রিয় উদ্যোগ না নেওয়া উদ্বেগজনক।
এদিকে চলতি বছরের মার্চ থেকে দেশে হামের সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে শুরু করে। সরকার এপ্রিল ও মে মাসজুড়ে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এবং মৃত্যুর ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামের পাশাপাশি এডিনো ভাইরাসের সহসংক্রমণ বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

