যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সংঘাত নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একদিকে কাতার, মিসর ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ যুদ্ধবিরতির উদ্যোগে মধ্যস্থতা করছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান ও পাল্টাপাল্টি হামলা আরও তীব্র হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—দুই দেশ কি শেষ পর্যন্ত এমন এক উত্তেজনার ফাঁদে আটকা পড়েছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন?
বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক আলোচনা চললেও মাঠের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সামরিক পদক্ষেপ বাড়তে থাকায় সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই।
যুদ্ধবিরতির নতুন উদ্যোগ
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, সংঘাত কমাতে একাধিক মধ্যস্থতাকারী দেশ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তবে তিনি আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করেননি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কাতার, মিসর ও পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কাছে একটি ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবে রয়েছে—
- ১০ দিনের জন্য সব ধরনের সামরিক অভিযান স্থগিত রাখা।
- হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করা।
- আগের সমঝোতা স্মারক পুনরায় কার্যকর করা।
- নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করা।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে। ফলে এই নৌপথে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন প্রস্তাবে উত্তর ও দক্ষিণ—দুই নৌপথই নিরাপদভাবে চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে ট্রানজিট ফি পরিচালনার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
বাস্তবে কেন বাড়ছে সংঘাত?
যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই সামরিক অবস্থান আরও শক্ত করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে—
- যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভেতরে আরও গভীরে সামরিক হামলা চালিয়েছে।
- প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
- ইরানও হরমুজ প্রণালি ও আঞ্চলিক বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা জোরদার করেছে।
- সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এতে করে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
আগের সমঝোতা কেন ব্যর্থ হয়েছিল?
গত এপ্রিল দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর মাধ্যমে সংঘাত সাময়িকভাবে কমলেও পরে দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের চুক্তির ভাষা ছিল তুলনামূলক অস্পষ্ট। ফলে উভয় দেশ নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। সেই দুর্বলতাই শেষ পর্যন্ত সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
বিশেষজ্ঞদের মত
যুক্তরাজ্যের ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাইমন ম্যাবনের মতে, নতুন যেকোনো চুক্তিতে স্পষ্ট শর্ত ও নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। তা না হলে আগের মতো ভুল বোঝাবুঝি আবারও সংঘাত বাড়িয়ে দিতে পারে।
তিনি বলেন, ইরানের জন্য হরমুজ প্রণালি এখনো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার। তাই এই নৌপথকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সহজে কমবে না।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হলে—
- বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।
- আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
- তেলের দাম বাড়তে পারে।
- আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হতে পারে।
এ কারণেই বিভিন্ন দেশ দ্রুত যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ওপর জোর দিচ্ছে।
সামনে কী হতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েকদিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়, তাহলে উত্তেজনা কিছুটা কমতে পারে। তবে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক আলোচনার সফলতাই নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নতুন সমঝোতার পথে হাঁটবে, নাকি সংঘাত আরও বিস্তৃত হবে।

