ঢাকা: দেশের ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় নতুন আইনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ‘সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন (ডামা)’ অনুযায়ী, লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কিনে তা পুনরুদ্ধার, পুনর্গঠন এবং প্রয়োজন হলে জামানত বিক্রির দায়িত্ব পালন করতে পারবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ইতোমধ্যে আইনের খসড়া প্রকাশ করেছে এবং বিভিন্ন পক্ষের মতামত আহ্বান করেছে।
কী পরিবর্তন আসছে?
বর্তমানে খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলো মূলত অর্থঋণ আদালতের ওপর নির্ভরশীল। নতুন আইন কার্যকর হলে ব্যাংক চাইলে খেলাপি ঋণ বিশেষায়িত সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করতে পারবে। এরপর ওই প্রতিষ্ঠান ঋণ পুনরুদ্ধার, পুনর্গঠন, জামানত ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজন হলে সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে অর্থ আদায়ের উদ্যোগ নেবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে থাকবে তদারকি
প্রস্তাবিত আইনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই ইউনিট লাইসেন্স প্রদান, তদারকি, জরিমানা আরোপ, প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল এবং খেলাপি ঋণের কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে।
কী করতে পারবে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি?
নতুন আইনের আওতায় গঠিত কোম্পানিগুলো—
- খেলাপি ঋণ ক্রয় করতে পারবে
- ঋণ পুনর্গঠন করতে পারবে
- ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর করতে পারবে
- ব্যবসার অংশ বা পুরো প্রতিষ্ঠান বিক্রি কিংবা ইজারা দিতে পারবে
- নতুন বিনিয়োগকারী এনে প্রতিষ্ঠান সচল রাখার উদ্যোগ নিতে পারবে
অর্থাৎ শুধু জামানত বিক্রি নয়, ব্যবসা টিকিয়ে রেখে ঋণ আদায়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
থাকবে ঋণ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানও
খসড়ায় পৃথক লোন সার্ভিসার কোম্পানি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। তারা ঋণগ্রহীতার সঙ্গে সমঝোতা, পুনঃতফসিল, সম্পদের মূল্যায়ন, তথ্য সংগ্রহ ও আইনি প্রক্রিয়ায় সহায়তা করবে। তবে তারা নিজেরা মামলা করতে বা জনসাধারণের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ করতে পারবে না।
সংকটাপন্ন ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকার বেশি
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৫ অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি, অবলোপন, পুনঃতফসিল ও আদালতের স্থগিতাদেশে থাকা ঋণ মিলিয়ে সংকটাপন্ন ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, এই আইন সফল করতে হলে—
- বাজারভিত্তিক মূল্যে খেলাপি ঋণ কেনাবেচার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
- ঋণ হস্তান্তরের আইনি জটিলতা দূর করতে হবে।
- জামানত ও সংশ্লিষ্ট আইনি অধিকার নির্বিঘ্নে নতুন প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থানান্তরের স্পষ্ট বিধান রাখতে হবে।
বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ
খসড়া আইনে খেলাপি ঋণের বিপরীতে বন্ড বা অন্যান্য আর্থিক সিকিউরিটি ইস্যুর সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে তহবিল গঠনের সুযোগও থাকবে। তবে এই ব্যবসার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার অনুমতি থাকবে না।
কঠোর নজরদারির আওতায় থাকবে প্রতিষ্ঠান
লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ইউনিট। প্রয়োজন হলে নিরীক্ষা, তদন্ত, জরিমানা কিংবা লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের ক্ষমতাও থাকবে তাদের হাতে।
বিশ্লেষকদের মতে, আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় একটি বিশেষায়িত বাজার তৈরি হবে। এতে ব্যাংকের অচল সম্পদ কমবে, নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

