Homeবাণিজ্যব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, সংস্কারে ৫ বছরের পরিকল্পনা

ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, সংস্কারে ৫ বছরের পরিকল্পনা

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে চিহ্নিত করেছে সরকারের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। এ ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনগত স্বায়ত্তশাসন আইনিভাবে নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাধা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জিইডির ‘ফাইভ-ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি সমন্বিত সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের চাপে রয়েছে। এর প্রভাবে ব্যাংকগুলোর মূলধন ও মুনাফা অর্জনের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। জিইডির পরিকল্পনায় ২০৩১ সালের মধ্যে এই হার ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বড় বাধা

জিইডির প্রতিবেদনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে ব্যাংক খাতের সর্বোচ্চ ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ঋণ অনুমোদন, নিয়োগ, খেলাপি ঋণ পুনর্গঠন এবং ব্যাংকের লাইসেন্স পাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের দুর্বল ভূমিকা এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ দেওয়ার সংস্কৃতিও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, ব্যাংক খাতের সংস্কার ও পুনর্গঠনের কোনো বিকল্প নেই। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রয়োজনীয় স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংক খাতের অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

পাঁচ বছরে তিন ধাপে সংস্কার

জিইডির প্রস্তাব অনুযায়ী ব্যাংক খাতের সংস্কার তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রথম বছর গুরুত্ব পাবে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষতি কমানোর ওপর। উচ্চঝুঁকির ব্যাংক শনাক্ত করে আমানতকারী ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, সংকটাপন্ন ব্যাংকের ওপর কঠোর নজরদারি এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ পর্যায়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার জন্য ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ নীতি কার্যকর করার পাশাপাশি অনিয়মে জড়িত বা ব্যর্থ পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের কথাও বলা হয়েছে।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছর হবে ব্যাংকগুলোর আর্থিক পুনর্গঠন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার সময়। বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর নজরদারি বাড়ানো, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং নিয়মিত স্ট্রেস টেস্ট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক নিয়োগের মানদণ্ড নির্ধারণ এবং একই পরিবারের সদস্যদের পরিচালক হওয়ার সংখ্যা ও মেয়াদে সীমাবদ্ধতা আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

চতুর্থ ও পঞ্চম বছর দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ সময় ব্যাংকিং খাতের আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

খেলাপি ঋণ কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ

ব্যাংক খাতের সংকট কাটাতে শুধু নতুন ঋণ বিতরণ বাড়ানো যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে জিইডি। বরং আগে ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করা এবং খেলাপি ঋণ আদায় ও অবলোপনের মাধ্যমে আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

খেলাপি ঋণ কমাতে পারলে ব্যাংকগুলো পরবর্তীতে এসএমই, কৃষি ও শিল্প খাতের মতো উৎপাদনশীল খাতে নিরাপদে ঋণ দিতে পারবে। এর ফলে বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোর সুযোগ তৈরি হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ