Homeলাইফস্টাইলদুই জাপানি শিক্ষার্থীর চোখে বাংলাদেশ: ছয় দিনের ভ্রমণে বদলে গেল অনেক ধারণা

দুই জাপানি শিক্ষার্থীর চোখে বাংলাদেশ: ছয় দিনের ভ্রমণে বদলে গেল অনেক ধারণা

জাপানের আকিতা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির দুই শিক্ষার্থী দাইকি ইশিদা ও আকারি সুয়েনো প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এসে কাটিয়েছেন ছয় দিন। নির্দিষ্ট কোনো ভ্রমণ পরিকল্পনা ছাড়াই তাঁরা ঘুরেছেন ঢাকার বিভিন্ন এলাকা, খেয়েছেন স্থানীয় খাবার এবং কথা বলেছেন নানা বয়সী মানুষের সঙ্গে।

কার্জন হলের বারান্দায় হঠাৎ কয়েকজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাঁদের পরিচয় হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন বন্ধুত্ব ও বাংলাদেশের মানুষকে কাছ থেকে জানার অভিজ্ঞতা।

আকারির বাবা কর্মসূত্রে বাংলাদেশে থাকেন। তাঁর কাছ থেকেই বাংলাদেশ সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হয় আকারির। সেই আগ্রহ থেকেই বন্ধু দাইকিকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন তিনি।

মানুষের আন্তরিকতায় মুগ্ধ

ঢাকার নিউমার্কেটে চায়ের দোকান খুঁজতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন দুই জাপানি শিক্ষার্থী। একজন পথচারীর কাছে সাহায্য চাইলে তিনি শুধু পথ দেখিয়েই থামেননি, তাঁদের চায়ের দোকান পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে চা খাওয়ান।

এই ধরনের ছোট ছোট মানবিক আচরণ তাঁদের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে সহজে কথা বলা, হাসিমুখে সাহায্য করা এবং দ্রুত বন্ধুত্ব তৈরি করার বাংলাদেশের সংস্কৃতি তাঁদের বিশেষভাবে ভালো লেগেছে।

আকারি বাংলাদেশ সম্পর্কে আসার আগে কিছুটা ভিন্ন ধারণা পোষণ করতেন। কিন্তু ঢাকায় এসে তাঁর সেই ধারণার অনেকটাই বদলে যায়।

খাবারেও নতুন অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশের স্ট্রিট ফুড নিয়ে শুরুতে কিছুটা চিন্তিত ছিলেন আকারি। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো সমস্যা ছাড়াই বিভিন্ন স্থানীয় খাবার উপভোগ করেছেন তিনি।

দাইকি বিশেষভাবে পছন্দ করেছেন নান রুটি ও বিরিয়ানি। তাঁর মতে, জাপানেও নান পাওয়া যায়, তবে বাংলাদেশের নানের স্বাদ ও গঠন আলাদা। কম দামে সুস্বাদু খাবার পাওয়ার বিষয়টিও তাঁর ভালো লেগেছে।

বাংলাদেশের পোশাকের দোকানের অভিজ্ঞতাও দাইকিকে অবাক করেছে। দোকানে কেনাকাটা করতে গেলে চা বা কফি দিয়ে আপ্যায়ন করার বিষয়টি জাপানে তাঁর পরিচিত অভিজ্ঞতার বাইরে।

বাংলাদেশ ও জাপানকে যেভাবে দেখেছেন

দাইকি মনে করেন, দুই দেশের মানুষের জীবনযাপনে বড় একটি পার্থক্য হলো সামাজিক যোগাযোগের ধরন। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জাপানে মানুষ অনেক সময় স্মার্টফোনে ব্যস্ত থাকে। অন্যদিকে বাংলাদেশে অপরিচিত মানুষও সহজে কথা বলে এবং সম্পর্ক তৈরি করে।

জাপান যদি বাংলাদেশ থেকে কোনো একটি বিষয় শিখতে পারে, তাহলে সেটি হতে পারে মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা—এমনটাই মনে করেন তিনি।

তবে বাংলাদেশের সব অভিজ্ঞতা ইতিবাচক ছিল না। ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা তাঁদের কাছে বেশ বিশৃঙ্খল ও ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়েছে। স্থানীয় মানুষের জন্যও সড়কব্যবস্থা আরও নিরাপদ হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেছেন দাইকি।

ভাষায় জমেছে বাংলাদেশের স্মৃতি

বাংলাদেশ সফরের সময় দাইকি কয়েকটি বাংলা শব্দও শিখেছেন। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে—‘আসসালামু আলাইকুম’, ‘ধন্যবাদ’ ও ‘দাম কত’।

আকারি শিখেছেন ‘সুস্বাদু’ শব্দটি। খাবারের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় শব্দটি তাঁর কাছে বিশেষভাবে মনে ধরেছে।

বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে জাপান সম্পর্কে প্রশংসা শুনেও তাঁরা আনন্দ পেয়েছেন। জাপানি সংস্কৃতি, বিশেষ করে অ্যানিমে নিয়ে কথা বলার সুযোগ খুব বেশি না হলেও দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক আগ্রহ তাঁদের ভালো লেগেছে।

বাংলাদেশে ভ্রমণের সময় জাপানের দুই শিক্ষার্থী
বাংলাদেশ ভ্রমণে স্থানীয় সংস্কৃতি, খাবার ও মানুষের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন দুই জাপানি শিক্ষার্থী।

ছয় দিনের ভ্রমণের সবচেয়ে বড় শিক্ষা

দাইকি তাঁদের পুরো বাংলাদেশ সফরকে জাপানি প্রবাদ ‘ইচিগো ইচিয়ে’ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। এর অর্থ—একবার, এক সাক্ষাৎ; অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি সাক্ষাৎ ও মুহূর্তকে মূল্য দেওয়া উচিত, কারণ একই মুহূর্ত আর কখনো ঠিক একইভাবে ফিরে আসে না।

কার্জন হলে হঠাৎ পরিচয় হওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা, নিউমার্কেটে অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে পাওয়া এক কাপ চা কিংবা ঢাকার রাস্তায় মানুষের সঙ্গে ছোট ছোট কথোপকথন—সবকিছুই তাঁদের কাছে হয়ে উঠেছে বিশেষ স্মৃতি।

ছয় দিনের বাংলাদেশ সফর শেষে তাঁরা শুধু কয়েকটি দর্শনীয় স্থান দেখে ফেরেননি। সঙ্গে নিয়ে গেছেন বাংলাদেশের মানুষের আন্তরিকতা, স্থানীয় খাবারের স্বাদ, নতুন বন্ধুত্ব এবং এমন কিছু মুহূর্ত—যেগুলো তাঁদের কাছে আরেকবার একইভাবে ফিরে আসবে না।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ