কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি দ্রুত শিক্ষাক্ষেত্রে প্রবেশ করলেও এর ব্যবহার নিয়ে এখনো একক কোনো জাতীয় নীতিমালা নেই যুক্তরাষ্ট্রে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যের ৯৮ জন কিশোর-কিশোরী একত্র হয়ে স্কুলে এআই ব্যবহারের জন্য একটি প্রস্তাবিত নীতিমালা তৈরি করেছে, যা ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের এডওয়ার্ড এম কেনেডি ইনস্টিটিউটের প্রতিকৃতি সিনেট কক্ষে বসে এআই ব্যবহারের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিতর্ক করে। দীর্ঘ আলোচনার পর তারা “স্টুডেন্টস ফার্স্ট অ্যাক্ট” নামে একটি প্রস্তাব পাস করে, যা ৮২-১৬ ভোটে অনুমোদিত হয়।
যদিও এটি কোনো সরকারি আইন নয়, তবুও যুক্তরাষ্ট্রের হাজারো স্কুলনেতার সংগঠন এএএসএ এই প্রস্তাবের সুপারিশগুলো তাদের সদস্যদের কাছে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
পরীক্ষায় এআই ব্যবহারে কড়াকড়ি
শিক্ষার্থীদের তৈরি নীতিমালায় বলা হয়েছে, এআই যেন শিক্ষার্থীদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও শেখার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সে জন্য স্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ জরুরি।
প্রস্তাব অনুযায়ী, গ্রেড নির্ধারণে ব্যবহৃত পরীক্ষাগুলোতে এআই ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। তবে অষ্টম শ্রেণির পর শিক্ষার্থীরা ধারণা তৈরি, সম্পাদনা এবং শিক্ষাসহায়ক কাজে এআই ব্যবহার করতে পারবে।
তবে কোনো অবস্থাতেই এআই দিয়ে পুরো অ্যাসাইনমেন্ট বা লিখিত কাজ তৈরি করার অনুমতি থাকবে না।
এআই ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের প্রস্তাব
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীরা যদি কোনো কাজে এআই ব্যবহার করে, তাহলে কোথায় এবং কীভাবে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করা হয়েছে তা উল্লেখ করতে হবে।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য মৌখিক পরীক্ষা, হাতে লেখা পরীক্ষা কিংবা সরাসরি আলোচনার মতো পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
শুধু সফটওয়্যারের সিদ্ধান্তে শাস্তি নয়
এআই শনাক্তকারী সফটওয়্যার ব্যবহার করে কোনো শিক্ষার্থীকে অভিযুক্ত করার ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মতে, বর্তমানে ব্যবহৃত অনেক এআই ডিটেকশন টুল শতভাগ নির্ভুল নয়। তাই কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে অন্তত দুইজন দায়িত্বশীল স্কুল কর্মকর্তার মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা উচিত।
এআই শিক্ষার শুরু হোক শুরু থেকেই
প্রস্তাবিত নীতিমালায় শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই এআই সম্পর্কে সচেতন করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
ডিভাইস ব্যবহার শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের এআইয়ের সুবিধা, সীমাবদ্ধতা, ভুল তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি, পক্ষপাত, চৌর্যবৃত্তি, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
শিক্ষকদের জন্যও নির্দিষ্ট নির্দেশনা
শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, শিক্ষকদের জন্যও এআই ব্যবহারের নির্দেশিকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, শিক্ষকরা পাঠ পরিকল্পনা তৈরি, অনুশীলনী প্রস্তুত, শিক্ষার্থীদের ফিডব্যাক প্রদান এবং পাঠদানের মান উন্নয়নে এআই ব্যবহার করতে পারবেন। তবে প্রতি সেমিস্টারে লিখিতভাবে জানাতে হবে কোন কাজে এআই ব্যবহার করা যাবে এবং কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
মানসিক সংকটে শিক্ষার্থীদের সহায়তায় এআই
স্কুলভিত্তিক এআই চ্যাটবট ব্যবহার নিয়ে আলোচনার সময় শিক্ষার্থীরা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষার্থী যদি চ্যাটবটের কাছে মানসিক সংকট বা আত্মক্ষতির ইঙ্গিত দেয়, তাহলে চ্যাটবট নিজে পরামর্শ না দিয়ে সংশ্লিষ্ট স্কুল কর্মকর্তাকে সতর্ক করবে, যাতে দ্রুত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা যায়।
ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থার নতুন ভাবনা
আয়োজকদের একজন এবং ডে অব এআইয়ের নির্বাহী পরিচালক জেফ্রি রাইলির মতে, এআই নিয়ে বড়দের মধ্যে এখনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি। তাই শিক্ষার্থীদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে সামনে এনে ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থার জন্য কার্যকর দিকনির্দেশনা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।
এই উদ্যোগ শুধু স্কুলে এআই ব্যবহারের নিয়ম তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য শিক্ষার্থীদের কীভাবে প্রস্তুত করা হবে, সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজারও একটি প্রচেষ্টা।

