টিস্যু কালচার প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাচের বোতলে রোগমুক্ত চারা উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। আধুনিক এই প্রযুক্তির ফলে এখন দেশেই কলা, আনারস, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল, অর্কিড, লিলিয়াম, জারবেরা, স্টেভিয়াসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ফল, ফুল ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদের উন্নতমানের চারা উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগমুক্ত ও উচ্চফলনশীল চারা উৎপাদনে টিস্যু কালচার প্রযুক্তি দেশের কৃষি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। এতে বিদেশ থেকে চারা আমদানির নির্ভরতা কমার পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন খরচও কমছে।
দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে বিদেশি জাতের চারা
একসময় জি-৯ কলা, এমডি-২ আনারস, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল, অর্কিড ও জারবেরার মতো চারা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। বর্তমানে দেশের টিস্যু কালচার ল্যাবগুলোতেই এসব চারার বাণিজ্যিক উৎপাদন হচ্ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টার একাই দুই লাখের বেশি চারা বিক্রি করেছে। এতে সরকারের আয় হয়েছে প্রায় ৫২ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।
হর্টিকালচার সেন্টারের প্রধান আশুতোষ কুমার বিশ্বাস জানান, শুধু ফল নয়, ফুল ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদের চারা উৎপাদনও বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে এখানকার উৎপাদিত লিলিয়াম চারা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
কীভাবে তৈরি হয় হাজার হাজার চারা?
টিস্যু কালচার ল্যাবে নির্বাচিত সুস্থ মাতৃগাছ থেকে খুব ছোট একটি টিস্যু সংগ্রহ করা হয়। এরপর জীবাণুমুক্ত পরিবেশে বিশেষ পুষ্টিমাধ্যমে সেটিকে সংরক্ষণ করা হয়।
ধাপে ধাপে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে একটি ক্ষুদ্র টিস্যু থেকেই হাজার হাজার রোগমুক্ত চারা তৈরি করা সম্ভব হয়। পরে এসব চারা কৃষক ও উদ্যোক্তাদের কাছে সরবরাহ করা হয়।
মাঠপর্যায়ে মিলছে সফলতা
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার কৃষক আবদুল কাদের দেড় বিঘা জমিতে জি-৯ জাতের কলা চাষ করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন।
তিনি জানান, একটি জি-৯ কলার ছড়িতে ২৫০ থেকে ৩০০টি পর্যন্ত কলা ধরছে। যেখানে দেশীয় জাতের কলায় সাধারণত ১৩০ থেকে ১৬০টি কলা পাওয়া যায়।
অন্যদিকে বগুড়ার উদ্যোক্তা মো. রেজওয়ানুল ইসলাম টিস্যু কালচারে উৎপাদিত জারবেরা ফুলের চারা ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে তিনি প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা মূল্যের ফুল বিক্রি করছেন।

বছরে এক কোটি চারা উৎপাদনের লক্ষ্য
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতায় বর্তমানে মাদারীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহে তিনটি আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাব চালু রয়েছে। এছাড়া দেশের আরও আটটি জেলায় নতুন ল্যাব নির্মাণের কাজ চলছে।
সব ল্যাব পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে বছরে প্রায় এক কোটি রোগমুক্ত চারা উৎপাদন সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গত এক বছরে তিনটি ল্যাবে প্রায় ২ লাখ ১২ হাজার চারা উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৯৩ হাজারের বেশি চারা কৃষক ও উদ্যোক্তাদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে।
কৃষিতে নতুন দিগন্ত
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিস্যু কালচার প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো মাতৃগাছের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে রোগমুক্ত চারা উৎপাদন করা।
এর ফলে কৃষকের উৎপাদন বাড়ছে, চারার মান উন্নত হচ্ছে এবং বিদেশি চারার ওপর নির্ভরশীলতা কমছে। পাশাপাশি দেশের বাণিজ্যিক কৃষি আরও আধুনিক ও লাভজনক হয়ে উঠছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৭৬টি হর্টিকালচার সেন্টার থেকে বিভিন্ন জাতের ফল, ফুল ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদের চারা বিক্রি করা হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব কেন্দ্র থেকে চারা বিক্রি করে সরকারের আয় হয়েছে ৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় আরও বেশি।

