বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার পথে সবচেয়ে আলোচিত নাম ইলন মাস্ক। তবে তাঁর এই অভাবনীয় সম্পদ অর্জনের পেছনে শুধু ব্যক্তিগত মেধা ও ব্যবসায়িক দূরদর্শিতাই কাজ করেনি; গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে মার্কিন সরকারের আর্থিক সহায়তা ও নীতিগত সমর্থনও।
বিশ্লেষকদের মতে, টেসলা ও স্পেসএক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি সহায়তা না থাকলে আজকের অবস্থানে পৌঁছানো কঠিন হতো। টেসলার প্রাথমিক বিনিয়োগকারী এবং বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গারবার কাওয়াসাকির প্রধান নির্বাহী রস গারবারও মনে করেন, সরকারি সহায়তা ছাড়া এই দুই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতো না।
স্পেসএক্সের ক্ষেত্রে ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ফ্যালকন রকেট এবং ড্রাগন মহাকাশযান উন্নয়নের জন্য প্রায় ২৭ কোটি ৮০ লাখ ডলারের অনুদান দেয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এই সহায়তার পরিমাণ ৫০ কোটি ডলারের বেশি হয়। ২০০৮ সালে আর্থিক সংকটে পড়া স্পেসএক্সকে টিকিয়ে রাখতে নাসা ১৬০ কোটি ডলারের একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিও করে।
পরে ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে প্রথম ফ্যালকন-৯ উৎক্ষেপণের সময় ইলন মাস্ক নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, নাসার সহায়তা ছাড়া স্পেসএক্সের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হতো না।
অন্যদিকে, টেসলার উত্থানেও সরকারি সহায়তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ টেসলাকে প্রায় ৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের স্বল্পসুদে ঋণ দেয়। এই অর্থ ব্যবহার করেই প্রতিষ্ঠানটি তাদের জনপ্রিয় মডেল এস গাড়ি উৎপাদন শুরু করে, যা পরবর্তীতে টেসলার ব্যবসায়িক সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দেয়।
শুধু ঋণই নয়, বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার সম্প্রসারণে সরকারের কর-সুবিধাও টেসলাকে বাড়তি সুবিধা দেয়। বৈদ্যুতিক গাড়ি ক্রেতাদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া ফেডারেল করছাড় টেসলার বিক্রি বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই সুবিধার কারণে প্রতিষ্ঠানটি কয়েক শ কোটি ডলারের অতিরিক্ত আয় করতে সক্ষম হয়েছে।
তবে টেসলার সবচেয়ে বড় সুবিধা এসেছে পরিবেশবান্ধব নীতিমালার মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রে কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে চালু করা কর্মসূচির আওতায় অন্যান্য গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নিঃসরণ বজায় রাখতে হতো। যারা সেই মানদণ্ড পূরণ করতে পারত না, তাদের পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ‘নিঃসরণ ক্রেডিট’ কিনতে হতো। বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে টেসলা বিপুল পরিমাণ ক্রেডিট বিক্রি করে উল্লেখযোগ্য আয় করেছে।
এক পর্যায়ে টেসলার মোট আয়ের বড় অংশই এসেছে এই নিঃসরণ ক্রেডিট বিক্রি থেকে। ফলে সরকারি নীতিমালাও কোম্পানিটির আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমানে অবশ্য ইলন মাস্কের বিপুল সম্পদের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে ওয়াল স্ট্রিটের আস্থা। বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করছেন, টেসলা ভবিষ্যতে স্বচালিত রোবোট্যাক্সি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোবট এবং অন্যান্য উদ্ভাবনী প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন বাজার তৈরি করবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আস্থার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই—যখন সরকারি সহায়তা টেসলা ও স্পেসএক্সকে সংকট কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল।
রস গারবারের ভাষায়, সরকারি সহায়তার ফলে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সমাজ উপকৃত হয়েছে। তবে তাঁর মতে, করদাতাদের অর্থ বিনিয়োগের বিনিময়ে সরকারের কোম্পানিগুলোর মালিকানায় অংশ নেওয়া উচিত ছিল।
ইলন মাস্কের সাফল্যের গল্প তাই শুধু একজন উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়; এটি উদ্ভাবন, সরকারি নীতি, করদাতাদের অর্থায়ন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা আধুনিক প্রযুক্তি অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

