নিত্যপণ্য আমদানিতে এমজিআই শীর্ষে থেকে টানা তৃতীয়বারের মতো দেশের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি সবচেয়ে বেশি নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করেছে। একই সময়ে টি কে গ্রুপ দ্বিতীয়, স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের শীর্ষ আমদানিকারক সিটি গ্রুপ দুই ধাপ পিছিয়ে নেমে গেছে চতুর্থ অবস্থানে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রকাশিত আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চিনি, পাম তেল, সয়াবিন তেল, সয়াবিন বীজ, গম, মসুর ডাল, মটর ডাল ও ছোলাসহ সাতটি প্রধান নিত্যপণ্যের আমদানিতে গত অর্থবছরে দেশের বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে এসব নিত্যপণ্য আমদানি হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৫৪ লাখ টন, যার মোট মূল্য প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় আমদানির পরিমাণ প্রায় ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও ব্যয় বেড়েছে মাত্র ৩ শতাংশের কম। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েকটি পণ্যের দাম কমে যাওয়ায় এই পার্থক্য তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এমজিআইর আধিপত্য আরও শক্তিশালী
বিদায়ী অর্থবছরে এমজিআই প্রায় ৩৩ লাখ টন নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করেছে, যার মূল্য প্রায় ১৫১ কোটি মার্কিন ডলার। মোট আমদানি ব্যয়ের প্রায় ২২ শতাংশ একাই করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি সরকারকে প্রায় ৩ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা রাজস্বও দিয়েছে এমজিআই।
চিনি, সয়াবিন বীজ এবং অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানিতে প্রতিষ্ঠানটি বাজারে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। এমজিআই চেয়ারম্যান মোস্তফা কামালের ভাষ্য, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আগাম আমদানির কারণেই তাদের আমদানি বেড়েছে।

পিছিয়ে পড়েছে সিটি গ্রুপ
একসময় দেশের নিত্যপণ্য আমদানিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ছিল সিটি গ্রুপ। তবে গত কয়েক বছরে বিভিন্ন খাতে নতুন বিনিয়োগ এবং আর্থিক চাপের কারণে প্রতিষ্ঠানটির নিত্যপণ্য আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে সিটি গ্রুপ মাত্র ৫৬ কোটি ডলারের নিত্যপণ্য আমদানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম। ফলে প্রতিষ্ঠানটি দ্বিতীয় স্থান থেকে নেমে চতুর্থ স্থানে চলে গেছে।
দ্বিতীয় স্থানে টি কে গ্রুপ
এক ধাপ এগিয়ে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে টি কে গ্রুপ। বিদায়ী অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৭৯ কোটি ডলার ব্যয়ে প্রায় ১০ লাখ টন নিত্যপণ্য আমদানি করেছে। বর্তমানে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানিতে বাজারের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে টি কে গ্রুপ।
স্মাইল ফুডের দ্রুত অগ্রগতি
এবারের তালিকায় তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস। চিনি পরিশোধনাগার ও ভোজ্যতেল কারখানায় নতুন বিনিয়োগের ফলে প্রতিষ্ঠানটির কাঁচামাল আমদানি দ্রুত বেড়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে তারা প্রায় ৭০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।
ডেল্টা এগ্রোফুডের বড় উত্থান
সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হয়েছে ডেল্টা এগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজের। গত অর্থবছরে ১৩তম অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানটি এবার সাত ধাপ এগিয়ে ষষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছে। নারায়ণগঞ্জে নতুন প্রক্রিয়াজাত কারখানা চালু হওয়ার ফলে তাদের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রাণ–আরএফএলও সেরা দশে
প্রাণ–আরএফএল গ্রুপও নিত্যপণ্য আমদানিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। গত বছরের ১২তম অবস্থান থেকে এবার নবম স্থানে উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন বিনিয়োগের ফলে কাঁচামাল আমদানি বাড়ায় তাদের বাজার অংশীদারিত্বও বেড়েছে।
বদলে যাচ্ছে বাজারের চিত্র
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের নিত্যপণ্য আমদানির বাজারে পুরোনো সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এমজিআই তার নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী করেছে, টি কে গ্রুপ ও স্মাইল ফুড এগিয়ে এসেছে, ডেল্টা এগ্রোফুড ও প্রাণ–আরএফএল দ্রুত উত্থান ঘটিয়েছে। বিপরীতে দীর্ঘদিনের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। ফলে আগামী বছরগুলোতে নিত্যপণ্য আমদানির বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

