দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ভারতের তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন জনপ্রিয় অভিনেতা ও তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে) দলের প্রধান থালাপতি বিজয়। রোববার (১০ মে) সকালে চেন্নাইয়ের নেহরু স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
চলচ্চিত্র জগতের সুপারস্টার থেকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসার এই যাত্রা ছিল থালাপতি বিজয়ের জন্য অত্যন্ত নাটকীয় ও আলোচিত। পর্দায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা নায়ক হিসেবে পরিচিত বিজয় এবার বাস্তব রাজনীতিতেও মানুষের আস্থা অর্জন করে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছালেন।
থালাপতি বিজয়ের প্রকৃত নাম জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তামিল চলচ্চিত্রে সফল ক্যারিয়ার গড়ে তোলা এই অভিনেতা জনপ্রিয়তা, ভক্তসমর্থন ও সামাজিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক মঞ্চে নিজের অবস্থান শক্ত করেন।
তার রাজনৈতিক উত্থানের শুরু ২০০৯ সালে। সে সময় তিনি নিজের ভক্তদের সংগঠিত করে ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’ নামে একটি সংগঠন গঠন করেন। শুরুতে এটি সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনটি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে শুরু করে।
২০১১ সালে সংগঠনটি এআইএডিএমকে জোটকে সমর্থন দেয়। এটিকেই বিজয়ের প্রথম প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা হিসেবে দেখা হয়। পরবর্তী সময়ে তার সিনেমা, জনসভা এবং সামাজিক বক্তব্যে রাজনৈতিক বার্তা আরও স্পষ্ট হতে থাকে।
বিশেষ করে ২০১৯ সালে ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নিয়ে সমালোচনার মাধ্যমে তিনি জাতীয় রাজনীতিতেও আলোচনায় আসেন। একইসঙ্গে তরুণদের বেকারত্ব, দুর্নীতি, সুশাসন ও সামাজিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কথা বলতে থাকেন, যা তরুণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
২০২১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’-সমর্থিত প্রার্থীদের সাফল্য বিজয়ের রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। বিশ্লেষকদের মতে, সেখান থেকেই তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বিকল্প শক্তি হিসেবে বিজয়ের অবস্থান শক্ত হতে শুরু করে।
অবশেষে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম’ (টিভিকে) নামে রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেন। দল ঘোষণার সময় তিনি জানান, তামিলনাড়ুর প্রচলিত দুই বড় রাজনৈতিক শক্তি ডিএমকে ও এআইএডিএমকের বাইরে জনগণের জন্য একটি নতুন বিকল্প গড়ে তুলতেই তার এই উদ্যোগ।
রাজনীতিতে পুরোপুরি মনোযোগ দিতে একই সময়ে অভিনয়জগৎ থেকেও বিদায়ের ঘোষণা দেন বিজয়। প্রায় ৭০টির বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর তিনি জানান, রাজনীতি তার কাছে সাময়িক আগ্রহ নয়, বরং পূর্ণকালীন দায়িত্ব।
এরপর দ্রুত সময়ের মধ্যেই টিভিকে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। জেলা কমিটি, তৃণমূলভিত্তিক সাংগঠনিক কাঠামো এবং পরিকল্পিত প্রচারণার মাধ্যমে দলটি তরুণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি দমন ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দলটির মূল রাজনৈতিক বার্তা হয়ে ওঠে।
তবে রাজনৈতিক পথচলা পুরোপুরি মসৃণ ছিল না। ২০২৫ সালে টিভিকের একটি অনুষ্ঠানে পদদলিত হয়ে কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনায় দলটির ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। তবে সেই সংকটের সময় প্রকাশ্যে দায় স্বীকার করে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করেন বিজয়। তার এই আচরণ অনেকের কাছে তাকে দায়িত্বশীল ও পরিণত রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে চলচ্চিত্র জগতের তারকাদের উত্থানের ইতিহাস নতুন নয়। এর আগে ১৯৭৭ সালে কিংবদন্তি অভিনেতা এম জি রামচন্দ্রন মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত টানা এক দশক রাজ্য শাসন করেন। প্রায় ৪৯ বছর পর আবারও চলচ্চিত্র অঙ্গন থেকে উঠে আসা একজন জনপ্রিয় তারকা তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, থালাপতি বিজয়ের এই উত্থান শুধু একজন অভিনেতার রাজনৈতিক সফলতার গল্প নয়; এটি তামিলনাড়ুর তরুণ ভোটারদের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষারও প্রতিফলন।


