নৌপথে পণ্য পরিবহনের বিভিন্ন সেবা ও ফি বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্তে দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাতে পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, নতুন মাশুল কার্যকর হলে বিভিন্ন শিল্পের পরিবহন ব্যয় ১০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের বাজারমূল্যেও পড়বে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্য এবং আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আগে থেকেই চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে নৌপরিবহনের অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হলে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। তাই তারা সরকারের কাছে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
নতুন মাশুল কার্যকর
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সম্প্রতি জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জাহাজ চলাচল, টার্মিনাল, জেটি, পণ্য খালাসসহ প্রায় অর্ধশত সেবার ফি ও টোল পুনর্নির্ধারণ করেছে। নতুন হার ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে সর্বশেষ ২০১৯ সালে এসব মাশুল সমন্বয় করা হয়েছিল।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এ ধরনের বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি।
যেসব খাতে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ব্যয়
নতুন প্রজ্ঞাপনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেবায় উল্লেখযোগ্য হারে মাশুল বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- নৌপথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ (কনজারভেন্সি) ফি ৪০–৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ টাকা প্রতি টন।
- জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকারের ফি ১৪৪ টাকা থেকে ২৮০ টাকা প্রতি টন।
- পাইলটেজ ফি ৫০০ টাকা থেকে ৭৭৫ টাকা।
- মোংলা–ঘোষিয়াখালী ও গাবখান চ্যানেলের টোল প্রায় দ্বিগুণ।
- জেটিতে মালামাল খালাস ও বস্তাবন্দি সেবার চার্জও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, এসব পরিবর্তনের ফলে নদীপথে পণ্য পরিবহনের সামগ্রিক ব্যয় দ্রুত বাড়বে।
সিমেন্টসহ বিভিন্ন শিল্পে বড় প্রভাব
সিমেন্টশিল্প এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। কারণ, সিমেন্ট উৎপাদনের কাঁচামাল এবং প্রস্তুত পণ্য—উভয়ই মূলত নৌপথে পরিবহন করা হয়।
বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ) জানিয়েছে, নতুন মাশুল কার্যকর হলে সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবহন ও পরিচালন ব্যয় ৭০ শতাংশের বেশি বেড়ে যেতে পারে। বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে এই অতিরিক্ত ব্যয় সরাসরি ভোক্তার ওপর চাপানোও সহজ হবে না।
এ ছাড়া কার্গো জাহাজ পরিচালনাকারীরাও জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন সরকারি ফি যুক্ত হলে ব্যবসা পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
সরকারের অবস্থান
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘদিন অপরিবর্তিত থাকা হার বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই নতুন মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক আপত্তি বা পুনর্বিবেচনার আবেদন এলে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হতে পারে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
ব্যবসায়ীদের দাবি
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিল্প ও বাণিজ্য খাতের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন মাশুল কার্যকরের আগে সরকারকে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। অন্যথায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ভোক্তা পর্যায়েও মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

