বিশ্ব অর্থনীতি যখন একের পর এক সংকটের মুখোমুখি, তখনও তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি। বাণিজ্যযুদ্ধ, অভিবাসন নীতি, জ্বালানি সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মতো নানা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে—কী কারণে এত চাপের মধ্যেও মার্কিন অর্থনীতি স্থিতিশীল রয়েছে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোর অনেকগুলোই উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ধীর প্রবৃদ্ধির দ্বৈত চাপে পড়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সেই পরিস্থিতি পুরোপুরি দেখা যায়নি। মূল্যস্ফীতি কিছু সময়ের জন্য বেড়ে গেলেও অর্থনীতির গতি থেমে যায়নি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এর অন্যতম কারণ হলো মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোজন ক্ষমতা। বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়েও অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ এবং মূলধনি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে তারা চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
জ্বালানি খাতেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বদলে গেছে। গত দুই দশকে শেল তেল ও গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি উৎপাদনকারীতে পরিণত হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও তার প্রভাব আগের তুলনায় অনেক কম অনুভূত হচ্ছে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলোর বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল থাকায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বড় ধরনের সংকটে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলক নমনীয় অর্থনৈতিক কাঠামো তাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করেছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ঝুঁকি গ্রহণের সংস্কৃতিও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম উৎস। ব্যবসা সম্প্রসারণে শেয়ারবাজার ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সহজলভ্যতা উদ্যোক্তাদের নতুন উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত করে। ইউরোপের অনেক দেশে ব্যবসার অর্থায়ন এখনো ব্যাংকঋণনির্ভর, যা তুলনামূলকভাবে কম নমনীয়।
তবে এই ইতিবাচক চিত্রের আড়ালে কিছু উদ্বেগও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে আয় বৈষম্য বৃদ্ধি, আবাসন সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি অনেক মানুষের জন্য চাপ তৈরি করছে। শ্রমবাজার শক্তিশালী থাকলেও সমাজের সব শ্রেণি সমানভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে না।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে নতুন কর্মসংস্থান প্রত্যাশার চেয়ে বেশি তৈরি হয়েছে। তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির হারও বেড়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা।
বিশ্লেষকদের মতে, নমনীয় বাজারব্যবস্থা, শক্তিশালী বিনিয়োগ, জ্বালানি সক্ষমতা এবং দ্রুত অভিযোজনের ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রেখেছে। তবে মূল্যস্ফীতি, বৈষম্য এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে এই শক্ত অবস্থান ভবিষ্যতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

