দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেটের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তাঁর মতে, সরকারের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার প্রতিফলন থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে এই বাজেট।
তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবতার তুলনায় অত্যন্ত বড়। অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও এর অর্থায়নের উৎস নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
আহসান এইচ মনসুরের মতে, বাজেটে নির্ধারিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে। প্রত্যাশিত রাজস্ব সংগ্রহ না হলে বাজেট ঘাটতি আরও বাড়তে পারে, যা সরকারকে ব্যয় সংকোচন অথবা অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতার পথে ঠেলে দিতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকার যদি অতিরিক্তভাবে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের জোগান সংকুচিত হবে। এতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিও ব্যাহত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের মোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই বেসরকারি খাতনির্ভর। তাই এই খাতের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত না করা গেলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশি ঋণ ও সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর চাপ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
তবে বাজেটে ব্যবসাবান্ধব কিছু উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে প্রণোদনার ব্যবস্থা এবং ব্যবসা সহজীকরণের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে এসব বিনিয়োগ যেন প্রকৃত উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েও ইতিবাচক মন্তব্য করেন আহসান এইচ মনসুর। তাঁর মতে, পরিবারভিত্তিক সহায়তা কার্যক্রমকে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের আওতায় আনা গেলে তা আরও কার্যকর হতে পারে।
একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত না করা গেলে বাজেট বাস্তবায়ন জটিল হয়ে উঠবে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও মত দেন এই অর্থনীতিবিদ। তাঁর মতে, কর প্রশাসনে দক্ষতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রত্যক্ষ করের আওতা সম্প্রসারণ সময়ের দাবি। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর আহ্বান জানান তিনি।
সব মিলিয়ে আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। সঠিক নীতি, কার্যকর সংস্কার এবং বেসরকারি খাতের প্রতি সহায়ক মনোভাব ছাড়া বাজেটের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

