মু’তার যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য সাহস, আত্মত্যাগ ও ঈমানের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ৮ হিজরিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রায় ৩ হাজার সাহাবির একটি বাহিনী মু’তা অঞ্চলে প্রেরণ করেন। বর্তমান জর্ডানের ওই এলাকায় মুসলিম দূতকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছিল, যা ছিল চুক্তি ভঙ্গের গুরুতর অপরাধ। এরই প্রেক্ষিতে এই অভিযান পরিচালিত হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বাহিনীর নেতৃত্বের জন্য ধারাবাহিকভাবে তিনজন সাহাবির নাম নির্ধারণ করেছিলেন। প্রথমে ছিলেন হজরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.), এরপর হজরত জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) এবং পরে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, একজন শহীদ হলে পরবর্তীজন নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন।
মুসলিম বাহিনী মু’তায় পৌঁছে দেখতে পায়, রোমান ও তাদের মিত্রদের বিশাল সেনাবাহিনী তাদের সামনে অবস্থান করছে। সংখ্যায় মুসলমানরা অনেক কম হলেও ঈমান ও সাহসে তারা ছিলেন অটল।
যুদ্ধের শুরুতেই হজরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করতে করতে শহীদ হন। এরপর ইসলামের পতাকা তুলে নেন হজরত জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.)। তিনি অসীম সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যান। শত্রুর আঘাতে তাঁর ডান হাত কেটে গেলে তিনি বাম হাতে পতাকা ধরেন। পরে বাম হাতও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবুও তিনি পতাকা মাটিতে পড়তে দেননি। নিজের বুক ও শরীর দিয়ে পতাকাকে আঁকড়ে ধরে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। অবশেষে অসংখ্য আঘাতে তিনি শহীদ হন।
মদিনায় অবস্থান করেই রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর পক্ষ থেকে যুদ্ধের সংবাদ লাভ করেন। তিনি সাহাবিদের জানান, প্রথমে যায়েদ (রা.), এরপর জাফর (রা.) এবং পরে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) শহীদ হয়েছেন। রাসূল ﷺ আরও বলেন, আল্লাহ তাআলা জাফর (রা.)-কে জান্নাতে দুটি ডানা দান করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি উড়ছেন। এ কারণেই তিনি “জাফর আত-তাইয়ার” বা “ডানাওয়ালা জাফর” নামে পরিচিত হন।
মু’তার যুদ্ধ শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটি মুসলমানদের জন্য এক গভীর অনুপ্রেরণার শিক্ষা। হজরত জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়, সত্য ও আদর্শের পথে দৃঢ় থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
- দায়িত্ব কখনো মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়
- কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ও সাহস ধরে রাখতে হয়
- সত্য ও নীতির সঙ্গে আপস করা একজন মুমিনের কাজ নয়
- লক্ষ্য বড় হলে কষ্টকে ছোট মনে হয়
ইসলামের ইতিহাসে মু’তার যুদ্ধ আজও ঈমান, আত্মত্যাগ ও আদর্শের প্রতীক হয়ে রয়েছে।


